ভবিষ্যতের ফুটবলার ওদের মাঝে

সকাল থেকেই রাজধানীর আকাশ ভেঙে নামে বৃষ্টি। তাতে পল্টন ময়দানের মাঠ খেলার অনুপযোগী। অথচ সেই পানি-কাদা মাঠেই কী সুন্দর ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসল একঝাঁক কিশোর। জাতীয় স্কুল ফুটবল ফাইনালে জিতেছে নীলফামারীর ছমির উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। অধিনায়ক নাইম ইসলামের ১০ মিনিটে করা গোলেই নিশ্চিত হয় তাদের শিরোপা। তবে ম্যাচ ও শিরোপা জিতলেও হৃদয় জিতে নিয়েছিল প্রতিপক্ষ বেনাপোল উচ্চ বিদ্যালয়ের কিশোররা। নীলফামারীর স্কুলটি এগিয়ে গিয়েই ঘর সামলাতে মনোযোগী হয়ে ওঠে। তারপরও বেনাপোল তৈরি করে গেছে একাধিক গোলের সুযোগ। তাদের অধিনায়ক সাইদুর রহমান রাহুল বাঁদিক দিয়ে বারবার আক্রমণ গড়ে তৈরি করে দেয় গোলের সুযোগ। তবে গোল করার দায়িত্বে যারা ছিল, তারা পারেনি নীলফামারীর নিরেট রক্ষণে চিড় ধরাতে। তাই ভালো ফুটবল খেলেও সফল না হওয়ায় হতাশা ম্যাচ শেষে গ্রাস করে বেনাপোল উচ্চ বিদ্যালয়ের ফুটবলারদের।

নীলফামারীর আক্রমণভাগে নাইমকে আলাদা করে চেনা গেছে আসরের শুরু থেকেই। ৮ গোল করে সে হয়েছে সর্বোচ্চ গোলদাতা। তবে গোলে পিছিয়ে থাকলেও অসাধারণ ফুটবলে টুর্নামেন্ট সেরা বেনাপোল অধিনায়ক রাহুল। ফাইনাল সেরা হয়েছে নীলফামারীর স্কুলটির ডিফেন্সকে নেতৃত্ব দেওয়া জিলকত। আসর সেরা গোলকিপার অরুণচন্দ্র হাই স্কুলের সৌরভ সরকার।

গতকালের ফাইনালে দু’দলের ফুটবলারদের পরিকল্পিত ফুটবল দেখলে হতাশায় মুখ ফিরিয়ে নেওয়া অনেকের মনেই হয়তো নতুন আশার সঞ্চার ঘটত। তবে বড্ড অবহেলিত এই আসরের ফাইনাল দেখার প্রয়োজন মনে করেনি অনেকেই। দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্লাব কোচদের মোটাদাগে একটা অভিযোগ প্রায়ই করতে দেখা যায়। তৃণমূলে ভালো কোচ নেই বলে খুদে ফুটবলারদের ফুটবলের হাতেখড়ি হয় যেনতেন ভাবে। তাই তারা বড় মঞ্চে এসে খেই হারিয়ে ফেলে। কালকের ফাইনাল সেই ভুলটা ভাঙিয়ে দিতে পারত সেই সব সমালোচকের। তবে তাদের কারও মধ্যেই স্কুল পড়–য়াদের খেলা নিয়ে আগ্রহ নেই। কোচদের মতো বাফুফেতে কর্মকর্তা বনে যাওয়া সাবেক অনেক ফুটবলারও প্রয়োজন মনে করেননি এই ম্যাচ দেখার। ফলে এসব প্রতিভার হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রবল। এই মঞ্চে ভালো করাদের একটা তালিকা প্রতিবারের মতো এবারও করেছে বাফুফে। তবে তাদের কতজন যে টিকে থাকবে তা নিয়ে আছে সংশয়। কারণ, তাদের দীর্ঘমেয়াদে পরিচর্যা করার তেমন কোনো উদ্যোগ কখনই খুব একটা নেয় না বাফুফে। তাই এমন টুর্নামেন্ট হয়ে উঠতে পারে না ভবিষ্যতের পাইপলাইন।

তারপরও তৃণমূলের ফুটবলকে এগিয়ে নিতে যারা কাজ করছেন, তারা আশা ছাড়েন না। বড় কোনো প্রতিদানের আশা না করেই তারা কাজ করে যান ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো। নীলফামারী স্কুলটির কোচ আবদুল ওহাব একটা সময় বাফুফের তৃণমূল কোচ হিসেবে কাজ করেছেন। এখন নিজেই একটি ফুটবল একাডেমি চালাচ্ছেন। দলকে চ্যাম্পিয়ন করিয়ে এই কোচ বলেন, ‘আমার এতদিনের পরিশ্রম সফল হয়েছে। এর আগে তিনবার সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল আমাদের। এবার প্রথম ফাইনালে উঠেই ছেলেরা শিরোপার স্বাদ পেয়েছে। তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলেই পেয়েছে সাফল্য। এই ছেলেদের মধ্যে আমি ভালো সম্ভাবনা দেখতে পাই।’ বেনাপোল উচ্চ বিদ্যালয়ের কোচ জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার সাব্বির আহমেদ পলাশ ফাইনালে হারের হতাশাকে এক পাশে রেখে মাদক ও চোরাকারবারের চারণভূমি থেকে একঝাঁক ফুটবলারকে তুলে এনে ফুটবল খেলাতে পারাটাকেই দেখছেন বড় করে, ‘এদের অনেকেরই মাঠে আসার পেছনে অনেক গল্প লুকিয়ে আছে। এই পর্যায়ে এদের নিয়ে আসতে পেরে সত্যি আমি খুশি। ভালো পরিচর্যা পেলে এরাই এক সময় দেশকে প্রতিনিধিত্ব করবে।’

বেনাপোলের ছেলেদের চ্যালেঞ্জটা ছিল মাদক ও চোরাকারবারির হাতছানি থেকে নিজেদের দূরে রেখে ভালো ফুটবল খেলার। নীলফামারীর ছেলেদের গল্প দারিদ্র্য জয়ের। জয়সূচক গোল করা নাইমের গল্পটাই দেবে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা। ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায় মক কাপে খেলার স্বপ্ন দেখেছিলেন এই কিশোর। সিগারেট কোম্পানিতে সামান্য বেতনে চাকরি করা বাবা সে সময় পারেননি টাকার অভাবে ছেলেকে ঢাকায় ট্রায়ালে পাঠাতে। সেই কষ্ট বুকে চেপে হাল ছাড়েনি নাইম। এই টুর্নামেন্টে সেরা গোলদাতা হয়ে দেখিয়েছে প্রতিভাকে রুখে দেওয়া সম্ভব নয়।

এমন অনেক গল্পই আছে এই কিশোরদের। সে সবকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে তাদের প্রয়োজন শুধু একটু পরিচর্যা। বাফুফে সে কাজটা করলেই তারা পেয়ে যাবে এগিয়ে যাওয়ার সোপান। তা পেরিয়ে হয়তো তারাই এক সময় হয়ে উঠবে আগামীর মাঝি।