কপোতাক্ষ খনন

এক যুগের কষ্ট মুছে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন

দীর্ঘ এক যুগ ধরে জলাবদ্ধতা কেড়ে নিয়েছে ফসলি জমি। চাষাবাদের অভাবে চরম আর্থিক সংকটে কাটছিল প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবন। খুলনার পাইকগাছা উপজেলার রাড়–লী ইউনিয়নের বাঁকার চরের এমন দশা নিয়ে গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি দেশ রূপান্তরের ৯-এর পাতায় ‘৭০০ একর জমি বছরের ৬ মাস জলাবদ্ধ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অবশেষে এ অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পে ১০৫ কিলোমিটার খনন করা হচ্ছে। এর ফলে চাষাবাদের আওতায় আসবে বাঁকার চরের প্রায় ১৪ হাজার একর জমি। এখন দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি এবং তিন ফসলি জমি চাষ করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছেন চরের আশপাশের মানুষগুলো।

এলাকাবাসী জানায়, উপজেলার উত্তরে সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলা ও পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলী ইউনিয়নের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে কপোতাক্ষ নদ। এই নদের পাশেই বাঁকা গ্রামের বিলটির নাম ‘বাঁকার চর’। প্রায় ১৩ বছর আগেও এই বিলে আমন ও বোরো ধানের চাষ হতো। ২০০৬ সালের দিকে নদটি সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে যায়। তখন এই বিলের পানি নিষ্কাশনের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টি মৌসুমে পানি জমে জলাবদ্ধতার তৈরি হয়। বৃষ্টির পানি উঠে যায় ঘরের মধ্যে। ফলে ঘরের মধ্যে মাচা করে বসবাস করতে হয় বাসিন্দাদের। এমনকি মৃত ব্যক্তির দাফনও সম্ভব হতো না। এখন সেই মরা কপোতাক্ষে জোয়ার-ভাটার স্বপ্ন দেখছেন ২০ হাজার মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) যশোর কার্যালয় সূত্র জানায়, কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের আওতায় নদের উজান অংশে যশোরের চৌগাছার তাহেরপুর হতে মনিরামপুর চাকলা সেতু পর্যন্ত ৭৫ কিলোমিটার ও ভাটির অংশে খুলনার পাইকগাছার বোয়ালিয়া হতে কয়রা উপজেলার আমাদী পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার নদী খনন, তীর প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়ন, নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণ ও মেরামত, নদের দুই তীরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মেরামত করাসহ নদের সঙ্গে সংযুক্ত খাল খনন করা হবে। সরকারি অর্থায়নে ২০২০ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৪ সালের জুনে শেষ হবে। এতে ব্যয় হবে ৫৩১ কোটি ৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া এখানে ৩৫ বছর মেয়াদি জোয়ার-ভাটা নদী ব্যবস্থাপনা (টিআরএম) কার্যক্রম চালানোর  উদ্যোগ রয়েছে।

বাঁকা গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব মো. সোহবান আলী বলেন, ‘এই নদে বড় বড় লঞ্চ, স্টিমার চলত। নদী জীবন পেলে তা থেকে আমরা বাঁচতে পারব। তবে নদে জোয়ার-ভাটার ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে ১-২ বছরের মধ্যে পুরনো অবস্থায় ফিরে যাবে।’

সরেজমিনে বাঁকার চর এলাকায় দেখা গেছে, খনন কাজ চলছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার ইয়াকুব আলী বলেন, ‘আমি সাতক্ষীরার শাখিলা থেকে বাঁকার চর পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার খননের কাজ করছি। দিনরাত ২০টি এস্কেভেটর কাজ করছে। নদের সাড়ে ১৩ ফুট গভীর, উপরিতলে ২৪২ ফুট চওড়া ও নিচে ১০০ ফুট চওড়া হবে।’

রাড়–লী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘খননের ফলে জোয়ার-ভাটা হলে এসব মানুষের খুব উপকার হবে।’

পাউবো যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহীদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরার কয়েক লাখ মানুষ উপকৃত হবেন। কপোতাক্ষ প্রাণ ফিরে পাবে। দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। ২০২৩ সালের মধ্যে খনন কাজ শেষ হবে। পরবর্তীকালে টিআরএম কার্যক্রম করা হবে।’