জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপে তোলা ছবি

পৃথিবী সৃষ্টির আগের মহাবিশ্ব

এই প্রথম প্রকাশিত হলো পৃথিবী সৃষ্টির আগের মহাবিশ্বের সম্পূর্ণ রঙিন ছবি। সৃষ্টির অদেখা জগতকে আরও নিবিড়ভাবে দেখার এই সুযোগ এনে দিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (জেডব্লিউএসটি)। দেখা গেল পৃথিবীর চেয়েও প্রাচীন মহাবিশ্বের আদিম রূপ। টেলিস্কোপটি মহাশূন্যের গভীরতম অঞ্চলের হাজারো ছায়াপথের ছবি তুলে পাঠানোয় এই সুযোগ পাওয়া গেল। মজার বিষয় হলো, ছবিতে যেসব গুচ্ছ গুচ্ছ ছায়াপথের রূপ দেখা যাচ্ছে সেগুলো আসলে ৪৬০ কোটি বছর আগের। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে মহাশূন্যের যে অংশের ছবি এসেছে সেটির নাম দেওয়াহয়েছে এসএমএসিএস (স্ম্যাকস) ০৭২৩।

আরও সহজ করে বলতে গেলে, সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে আট মিনিট কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে। অর্থাৎ যে সূর্যকে আমরা দেখি সেটা সূর্যের আসল রূপের চেয়ে ৮ মিনিটের পুরনো। এই বাস্তবতায় এসএমএসিএস (স্ম্যাকস) ০৭২৩ থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে লাগে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর।  

ইনফ্রারেড প্রযুক্তিতে তোলা ছবিটি এখন পর্যন্ত মহাশূন্যের সবচেয়ে গহীনের সবচেয়ে ভালো মানের ছবি। কয়েক হাজার ছায়াপথ উঠে এসেছে ছবিটিতে। ছবিটি তুলেছে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের নেয়ার ইনফ্রারেড ক্যামেরা (এনআইআরক্যাম)। ১২ ঘণ্টারও বেশি সময়ে বিভিন্ন তরঙ্গের ইনফ্রারেড আলো ধরে ‘কম্পোজিট’ ছবিটি তোলা হয়েছে।  

নাসার ভাষ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর মাটিতে দাঁড়িয়ে কেউ তার এক হাত দূরের একটি বালুকণার দিকে তাকালে যে ক্ষুদ্রতা বুঝতে পারবে, পৃথিবীর আকাশে ঠিক ওই বালুকণার মতোই ক্ষুদ্র জায়গা দখল করে রেখেছে ছবিতে দেখানো ছায়াপথ গুচ্ছ।

নাসার জেডব্লিউএসটি আগের হাবল টেলিস্কোপের উত্তরসূরি বলা হচ্ছে। অনেক বেশি শক্তিশালী এই টেলিস্কোপ তৈরিতে খরচ হয়েছে ১ হাজার কোটি ডলার। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর টেলিস্কোপটি মহাশূন্যে রওনা দেয়। পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে এটি। প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি বছর আগে মহাবিশ্বে জ্বলে ওঠা আদি নক্ষত্রের ছবি তোলা এবং দূর-দূরান্তের গ্রহগুলো প্রাণ ধারণের উপযোগী কি-না, তা খতিয়ে দেখার কাজ করছে জেডব্লিউএসটি। 

গতকাল মঙ্গলবার জেডব্লিউএসটির তুলে আনা ছবিগুলো প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। তবে এর আগেই হোয়াইট হাউজে দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সামনে একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। 

বাইডেন বলেন, ‘এই ছবিগুলো পৃথিবীকে মনে করিয়ে দেবে যে আমেরিকা বড় কিছু করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ বিশেষ করে আমাদের শিশুদের মনে করিয়ে দেবেÑ যে আমাদের সাধ্যের বাইরে কিছু নেই।’

যেভাবে তোলা সম্ভব মহাবিশ্বের এত আগের ছবি? : কোনো বস্তু থেকে আলো যখন আমাদের চোখে এসে পড়ে তখন আমরা ওই বস্তুটি দেখতে পাই। খুব সহজ এই কথাটির ব্যাখ্যা আমাদের সাধারণ বোঝাপড়ায় জটিল হতে শুরু করে যখন আমরা অনেক দূরের জিনিস দেখার চেষ্টা করি।

উদাহরণ হিসেবে বলা চলে, চাঁদের দূরত্ব পৃথিবী থেকে মোটামুটি ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। আর আলোর গতি হচ্ছে, সেকেন্ডে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার। ফলে যে চাঁদটি আমরা ঠিক এই মুহূর্তে দেখতে পাচ্ছি তা আসলে এক সেকেন্ডের সামান্য আগের চাঁদ।

সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে লাগে প্রায় ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড। এর মানে হচ্ছে, ঠিক সূর্যাস্তের সময় আমরা যে সূর্য দেখি তা আসলে ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড আগেই অস্ত গেছে। এইভাবে, যত দূরের বস্তু আমরা দেখি, সেগুলোর আসলে তত আগের চেহারা আমরা দেখতে পাই।

নাসার জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের যে অংশের ছবি তুলেছে, সে অংশ থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে লাগে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর। ফলে যে ছবিটি টেলিস্কোপ তুলেছে, সেটি আসলে ৪৬০ কোটি বছর আগের চেহারা দেখাচ্ছে।

আজ তাহলে ওই অংশের চেহারা কেমন? সেটি জানা যাবে ওই একই নিয়মে ৪৬০ কোটি বছর পরে!