রাজশাহীর গোদাগাড়ীর রাজাবাড়ি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন এসে সংসদ সদস্য (এমপি) ওমর ফারুক চৌধুরী তাকে পেটানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এমপির সঙ্গে বসে ওই কলেজ অধ্যক্ষও বলেন, ‘ওমর ফারুক আমাকে মারধর করেননি।’
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজশাহী নগরীর ‘ওমর থিম প্লাজা’য় এমপি ওমর ফারুকের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। যে কার্যালয়েই গত ৭ জুলাই রাতে সেলিম রেজাকে পেটানো হয়েছিল বলে ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত অন্যদের কাছ থেকে জানা গিয়েছিল। গোদাগাড়ীর বিভিন্ন কলেজের আটজন অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষকে সেদিন ডেকেছিলেন সংসদ সদস্য ওমর ফারুক।
এদিকে এমপি ওমর ফারুক তাকে মারধর করেননি বলে সেলিম রেজা গতকাল দাবি করলেও রাজশাহীর শিক্ষক নেতারা মনে করছেন, তিনি চাপে পড়ে ও ভয়ে এমন কথা বলেছেন। এছাড়া অধ্যক্ষকে ‘সংসদ সদস্যের মারধর ও লাঞ্ছিত’ করার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, শিক্ষকসহ দেশের ২৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক। গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়। অন্যদিকে অধ্যক্ষ নির্যাতনের অভিযোগ পেয়ে ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক তার কার্যালয়ে গত ৭ জুলাই রাতে রাজাবাড়ি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে ‘পিটিয়ে’ আহত করেন বলে অভিযোগ উঠে। সেলিম রেজার সহকর্মীদের মাধ্যমে গত মঙ্গলবার ঘটনাটি প্রকাশ পায়। সেদিন সাংবাদিকরা নগরীর রায়পাড়ার বাসায় গেলে সেলিম রেজা তাদের কাছে পিটুনির অভিযোগ করে জানিয়েছিলেন, ঘটনার পর থেকে তিনি লজ্জায় বের হননি এবং আতঙ্কিত অবস্থায় রয়েছেন। তবে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এসে অধ্যক্ষ সেলিম রেজা আগের অবস্থান থেকে সরে যান। তিনি বলেন, ‘অধ্যক্ষ ফোরামের কমিটি গঠন ও অভ্যন্তরীণ অন্যান্য বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে আমাদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এ সময় এমপি আমাদের নিবৃত্ত করেন। এছাড়া আর অন্য কোনো ঘটনা ঘটেনি সেখানে।’
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে ওমর ফারুক চৌধুরী দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে মিথ্যা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এতে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হয়েছেন। আওয়ামী লীগের সম্মানহানি হয়েছে। ৭ জুলাইয়ের ঘটনা প্রসঙ্গে ওমর ফারুক চৌধুরী জানান, ওইদিন কোনো কলেজশিক্ষককে তিনি মারধর করেননি। এটা মিথ্যা কথা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাকে হেয় করার জন্য এমন তথ্য প্রচার করছে বলে দাবি করেন এই সংসদ সদস্য।
সংবাদ সম্মেলনে অধ্যক্ষ সেলিম রেজা বসেছিলেন ওমর ফারুক চৌধুরীর পাশেই। তিনি দাবি করেন, ওমর ফারুক চৌধুরী তাকে মারধর করেননি। সেলিম রেজা লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘গণমাধ্যমে যেভাবে বলা হচ্ছে যে সংসদ সদস্য আমাকে মারধর করেছেন তা ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে আমরা কয়েকজন অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ ঈদ উপলক্ষে এমপি সাহেবের অফিসে দেখা করতে গিয়েছিলাম। এ সময় আমাদের অধ্যক্ষ ফোরামের কমিটি গঠন এবং অভ্যন্তরীণ অন্যান্য বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক হয়। একপর্যায়ে এমপি মহোদয় আমাদের নিবৃত্ত করেন। এছাড়া আর অন্য কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
মারধরের শিকার না হলে ঘটনার রাতে চিকিৎসকের কাছে কেন গিয়েছিলেন সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যক্ষ সেলিম রেজা বলেন, ‘নিজেদের মধ্যে একটু ধাক্কাধাক্কি হয়েছিল।’
মারধরের ফলে তার হাতের কনুইয়ের কাছে বড় জখম হয়েছে বলে সাংবাদিকদের কাছে তথ্য রয়েছে জানিয়ে এক গণমাধ্যমকর্মী সেই জখম দেখতে চাইলে সেলিম রেজা তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। এমপি না মারলে তাকে কে মেরেছে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ কারও নাম না উল্লেখ করে বলেন, ‘সামান্য ধাক্কাধাক্কি হয়েছে অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে।’
এ সময় তার পাশে বসা গোদাগাড়ীর মাটিকাটা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক আবদুল আউয়াল রাজু অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে ধাক্কা মারার দায় নিজের কাঁধে নেন। রাজু জানান, ঈদ উপলক্ষে অধ্যক্ষ ফোরামের পক্ষ থেকে সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা করার জন্য তিনিই সব অধ্যক্ষকে ফোন করে ডাকেন। সেখানে ফোরামের কমিটি গঠন এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে তর্কবিতর্ক হয়। একপর্যায়ে তিনি নিজেই অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে ধাক্কা দেন। এ সময় সেখানে থাকা আলমারি ও চেয়ারে ধাক্কা খেয়ে সেলিম রেজা আহত হন। এমপি ওমর ফারুক তাদের থামিয়েছেন বলে দাবি করেন রাজু। একজন সংসদ সদস্যের সামনে শিক্ষকদের এমন আচরণের জন্য তিনি ক্ষমাও চান।
এর আগে গত বুধবার রাতে নিজের ফেইসবুক আইডিতে পোস্ট দিয়ে অধ্যক্ষ সেলিম রেজা দাবি করেন যে তাকে এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী মারধর করেননি। সেখানে তিনি লেখেন, ‘এমপি সাহেবের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, একটি কুচক্রী মহল আগামী ১৫ জুলাই তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে গোদাগাড়ী-তানোর নির্বাচনী এলাকায় ওমর ফারুক চৌধুরীর সুনাম, উন্নয়ন ও জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মনগড়া, কাল্পনিক, ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশ করেছে।’
তবে অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে চাপ দিয়ে ওই ফেইসবুক পোস্ট দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন রাজশাহী জেলা কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি শফিকুর রহমান বাদশা। গতকাল তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিনি (অধ্যক্ষ সেলিম রেজা) এখন হয়তো ভয়ে এসব বলছেন। ওই শিক্ষক কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তাহলে তানোরের কাউন্সিল নিয়ে তার মাথাব্যথা হওয়ার কথা নয়।’
এমপি ওমর ফারুক তাকে মারধর করেননি বলে সেলিম রেজা দাবি করলেও মারধরের অভিযোগ তদন্তে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। গতকাল কমিটির সদস্যরা রাজশাহী এসেছেন। কমিটির প্রধান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কাজ শুরু করেছি। বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলছি। তদন্তকাজ শেষে আমরা আপনাদের জানাব।’
অধ্যক্ষ ‘পেটানোর’ ঘটনায় উদ্বেগ ২৪ নাগরিকের : অধ্যক্ষকে ‘মারধর’-এর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, শিক্ষকসহ দেশের ২৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক। গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়।
বিবৃতিতে বিশিষ্টজনরা বলেন, ‘ওমর ফারুক চৌধুরী তার নিজ কার্যালয়ে ডেকে একজন কলেজশিক্ষককে নির্মমভাবে পেটানোর যে বর্ণনা আমরা গণমাধ্যমে পেয়েছি, তাতে আমরা বিস্মিত, স্তম্ভিত ও উদ্বিগ্ন। একজন আইনপ্রণেতা আইন লঙ্ঘন করতে পারেন না। সংসদ সদস্যের কলেজশিক্ষককে এভাবে পেটানোর ঘটনা ন্যক্কারজনক। জনপ্রতিনিধি হয়ে সমাজের সম্মানজনক পেশা শিক্ষকতায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে যে ঘৃণ্য অবমাননাকর মনোভাব প্রকাশ করেছেন, তাতে তিনি সংসদ সদস্যের শপথ ভঙ্গ করেছেন এবং সংসদ সদস্য পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন।’
বিবৃতি প্রদানকারী বিশিষ্টজনরা হলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রামেন্দু মজুমদার, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানাদাশ গুপ্ত, মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম, বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি নুর মোহাম্মদ তালুকদার, কৃষক সমিতির সভাপতি এসএমএ সবুর, মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির, উন্নয়নকর্মী রোকেয়া কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমএম আকাশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী পারভেজ হাসেম, জাতীয় শ্রমিক জোটের কার্যকরী সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ, বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক, গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক জীবনানন্দ জয়ন্ত, সংস্কৃতিকর্মী সেলু বাসিত, এ কে আজাদ, অলক দাসগুপ্ত, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা ও সংস্কৃতি মঞ্চের আহ্বায়ক সেলিম রেজা।