জামায়াতে ইসলামীর ২৬৩ নেতাকে খুঁজে পাচ্ছে না বলে পুলিশ জানালেও তারা এলাকায় বহাল তবিয়তে আছে। তাদের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার থানায় নাশকতাসহ একাধিক মামলা আছে। পুলিশের তালিকায় এসব নেতা ‘আত্মগোপনে’ রয়েছে।
সম্প্রতি জামায়াতের এসব নেতাকে খুঁজতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে রেঞ্জ ডিআইজি, পুলিশ সুপার ও পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট প্রধানদের কাছে। তারা জামিনে আছে কিনা সেই তথ্য নিতেও বলা হয়েছে। এমনকি তাদের যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন তাদের তালিকা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করে আসছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও থানা পুলিশের সঙ্গে অনেকটা আঁতাত করেই তাদের থাকতে হচ্ছে এলাকায়। তারমধ্যে কেউ কেউ গোপনে সক্রিয় হয়ে ওঠারও চেষ্টা চালাচ্ছেন। নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে দলকে চাঙ্গা হওয়ার চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মাঠ পর্যায়ের সদস্যরা পুলিশের ইউনিট প্রধানদের কাছে এসব তথ্য দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। যেসব নেতা এলাকায় আছেন তাদের তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। ওই তালিকাটি পুলিশ সদর দপ্তর হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে। বিষয়টি সরকারের হাইকমান্ডকেও অবহিত করা হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে।
পুলিশ সূত্র জানায়, তালিকা থাকলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের নাগাল পাচ্ছে না। তালিকায় ২৬৩ নেতার নাম এসেছে। বৈঠক হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।
নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জামায়াতের অনেক নেতা আছেন তারা নিষ্ক্রিয়। কিন্তু তারা এলাকায় আছেন বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে। তারা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করে আছেন। পুলিশের কাছে তারা আত্মগোপনে হিসেবেই থাকছেন। ইতিমধ্যে একটি তালিকা করা হয়েছে। তাদের বিষয়ে খোঁজ নিতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপারদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, তালিকায় ২৬৩ জনের নাম পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে নাশকতা, বিস্ফোরকসহ হত্যা মামলা রয়েছে। তাদের মধ্যে কারা জামিনে আছেন তাও খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে। এমনকি যারা তাদের আশ্রয়-প্রশয় দিচ্ছেন বা দিয়েছেন তাদেরও তালিকা করতে বলা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতা জামিন না নিয়ে আত্মগোপনে থাকলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এই নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।
জানা গেছে, একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে ২০১৩ সালে একটি রিটের আদেশে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে হাইকোর্ট। ২০১৮ সালে এটি গেজেট আকারে প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। সরকারবিরোধী আন্দোলনে জামায়াত-শিবির সারা দেশে ব্যাপক তা-ব চালায়। পেট্রল বোমা, বাসে আগুন দিয়ে সাধারণ নিরীহ মানুষ হত্যার মতো অভিযোগ ওঠে দলটির বিরুদ্ধে। নির্বাচনকালে ভোটকেন্দ্র পুড়িয়ে দেওয়া, প্রিসাইন্ডিং অফিসারকে হত্যা করার মতো কাজ করতেও দ্বিধাবোধ করেনি দলের নেতাকর্মীরা।
এই প্রসঙ্গে ডিবি পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে ২০৪৮ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার পরিকল্পনা এঁটেছে জামায়াতে ইসলামী। প্রায় ৪শ ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তুলেছে দলটি। এখনো বিদেশ থেকে ফান্ড এনে দলের কাজে ব্যবহার করছে। নাশকতা মামলায় অভিযুক্ত জামায়াত নেতাদের বিষয়ে খোঁজ নিতে বলা হয়েছে। নেতাদের ঠিকানা, স্থায়ী ঠিকানা, পেশা, দলীয় অবস্থান, নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস, মামলার রেকর্ডপত্র, কোন নেতার বিরুদ্ধে কয়টি মামলায় জামিনে আছে সেই তথ্য নেওয়া হচ্ছে। তবে যারা জামিনে এলাকায় আছে তাদের নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, রাজশাহীর পুঠিয়া, বাগমারা, দুর্গাপুর, চারঘাট, বাঘা, বোয়ালিয়া, রাজপাড়া, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, টেকনাফ, খুলনা, যশোর, কুমিল্লা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিলেটসহ ঢাকার ১২৮টি ওয়ার্ডসহ আরও কয়েকটি এলাকায় জামায়াত নেতাদের আনাগোনা বেশি। তারা এলাকায় প্রকাশ্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও থানার কতিপয় পুলিশ সদস্যের সঙ্গে আঁতাত করে এলাকায় চলাফেরা করছেন।
নাম প্রকাশ না করে কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় মাসখানেক আগে আত্মগোপনে থাকা জামায়াত নেতাদের বিষয়ে খোঁজখবর রাখতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বার্তা এসেছে। সেই অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। শান্ত পরিবেশ যদি কেউ অশান্ত করার চেষ্টা চালায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা এসেছে। জামায়াত নেতাদের যারা আশ্রয়-প্রশয় দিচ্ছেন তাদের তালিকাও করার নির্দেশনা এসেছে।