আম রপ্তানি বাড়াতে সংরক্ষণ প্ল্যান্ট হচ্ছে গাবতলীতে

বাংলাদেশ বিশ্বের প্রধান ১০টি আম উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে অষ্টম স্থানে রয়েছে। কিন্তু গুণগত মান নিশ্চিত না করায় শীর্ষ আম রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় নেই; বরং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। শুধু প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে পচন রোধ সম্ভব হয় না। আমের দ্রুত পচন রোধে ঢাকার গাবতলীতে ২৭ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে একটি বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্রযুক্তি সুবিধার প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি এই প্ল্যান্ট থেকে উদ্যোক্তারা আম প্রক্রিয়াকরণ করে বিদেশে রপ্তানি করতে পারবেন।

‘আম ও অন্যান্য সতেজ কৃষিপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিতে বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্ল্যান্ট স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বাস্তবায়ন করবে। পরিকল্পনামন্ত্রী ১৬ জুন সম্পূর্ণ সরকারি অনুদানে মোট ২৭ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন মেয়াদে অনুমোদন করেন। বিষয়টি জাতীয় অর্থনৈতিক নির্বাহী কমিটির (একনেক) অবগতির জন্য মঙ্গলবার উপস্থাপন করা হবে। প্রকল্পটি সদ্য শেষ হওয়া ২০২১-২২ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

গত বছরের ১৯ অক্টোবর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় কিছু পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত হয়। পরে পুনর্গঠিত প্রকল্প প্রস্তাবটি (ডিপিপি) বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) পিইসির সিদ্ধান্তগুলো প্রতিফলন করে চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়।

প্রকল্পটি চলতি জুলাই মাস থেকে শুরু হয়ে ২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এখনো প্রকল্পটি শুরু হয়নি। তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল তিন বছর না করে দুই বছরের মধ্যে শেষ করার পরামর্শ দিয়েছে।

কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের সূত্র বলছে, দেশে প্রচুর আম উৎপাদন হলেও শুধু প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট পায় না বাংলাদেশ। এই সনদপ্রাপ্তির কাজ সহজীকরণের জন্য পাইলট কার্যক্রম প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন।

তাপ প্রয়োগ প্রযুক্তি স্থাপনের জন্য ২০২৩ সালের মধ্যে ঢাকার গাবতলীতে একটি বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য। শুধু আমই নয়, পাশাপাশি অন্যান্য কষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে রপ্তানি বাড়ানো, বাজারজাত বাড়াতে কনভেয়ার প্যাকেজিং লাইন নির্মাণ করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার টন আমের শূককীট মুক্তকরণ, বিভিন্ন ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও পোকার ডিম মুক্ত করা হবে। এ ছাড়া ২৫ হাজার মেট্রিক টন সবজি সতেজ রাখার প্রক্রিয়াও থাকছে এখানে।

প্রকল্পটির পটভূমিতে বলা হয়েছে, আম পচনশীল ফল হওয়ায় শুধু প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে বিদেশিদের কাছে দেশের আমের গ্রহণযোগ্যতা কম। এই ফলের প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি না থাকায় আম উজ্জ্বল, বেশিদিন স্থায়ী করার পাশাপাশি বিভিন্ন জীবাণু, পোকামাকড় ও মাছিমুক্ত করা যায় না। ফলে ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট পেতে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় উদ্যোক্তাদের।

এ ছাড়া, দেশের আম বাজারজাতকারীরা পাকানো ও সংরক্ষণকালে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ কারণে আম রপ্তানি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দ্রুত পচন রোাধ করে স্থায়িত্ব বাড়ানো এবং ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট প্রাপ্তির সহজীকরণ প্রয়োজন। এ উদ্দেশ্যে পাইলট কার্যক্রম হিসেবে ঢাকার গাবতলীতে একটি বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্রযুক্তি সুবিধাসম্পন্ন প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ৫০০ বর্গমিটার আয়তনের একটি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র নির্মাণ। একটি বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্রযুক্তি মেশিন এবং একটি অটো কনভেয়ার প্যাকেজিং লাইন মেশিন স্থাপন। প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্টের জন্য বিদ্যুৎ সাবস্টেশন স্থাপন। ৫০০ রানিং মিটারের একটি সীমানাপ্রাচীর এবং ১ লাখ ৫০ হাজার লিটার পানি সংরক্ষণাগার নির্মাণ। রপ্তানিকারক বা উদ্যোক্তা, মেকানিক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্থানীয় প্রশিক্ষণ আয়োজনও করা হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ১ হাজার ৬২৩ টন আম বিদেশে রপ্তানি করা হয়। ইংল্যান্ড, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, হংকংসহ বিভিন্ন দেশে এসব আম রপ্তানি করা হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, বছরে দেশে ১ লাখ ৭৯ হাজার টন আম উৎপাদন হয়। এর মধ্যে নষ্ট হয় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় ৫ শতাংশ আমের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ আম নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষাসহ বিদেশে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন বাড়ানো হবে। এতে রপ্তানিও দ্বিগুণ হবে।