নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার দীঘলিয়ায় ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হিন্দুদের বেশ কয়েকটি বাড়ি, দোকানপাট ও একটি মন্দিরে ভাঙচুর এবং আগুন লাগিয়েছে ‘তৌহিদী জনতার’ নামে কিছু মানুষ। তাদের হামলায় আহত হয়েছে কয়েকজন। হিন্দু বাড়ি, দোকানের টাকা ও সোনা লুটের অভিযোগ করেছেন আক্রান্তরা। গত শুক্রবার দিনে ও রাতে ওই হামলার ঘটনা ঘটে।
নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে শান্তি বজায় রাখার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া মাশরাফী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারপ্রতি ২০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
বর্তমানে দীঘলিয়ার পরিস্থিতি থমথমে। সেখানে পুলিশ, র্যাব ও আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা টহল দিচ্ছেন।
এর আগে গত ১৮ জুন নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের এক ছাত্রের একই ধরনের ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে অভিযুক্ত ওই ছাত্র ও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে হেনস্তার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে আরও একটি ঘটনায় নড়াইল জেলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে চলেছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীঘলিয়ার নবগঙ্গা ডিগ্রি কলেজের এক শিক্ষার্থীর নামে একটি ফেইসবুক আইডি থেকে হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)কে নিয়ে কটূক্তি করে পোস্ট দেওয়া হয়। এরপর গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিক্ষুব্ধ লোকজন ওই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে তাদের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ করে। শুক্রবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত কয়েকশ লোক জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল করতে থাকে। এর মধ্যে লোহাগড়া থানা পুলিশ ওই শিক্ষার্থীর বাবাকে আটক করে নিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবাকে আটকের পরও বিক্ষোভরত লোকজন প্রথমে দীঘলিয়া বাজারে হিন্দুদের দোকান ভাঙচুর ও লুটপাট করে। এর পর তারা বাজারের পাশেই সাহাপাড়ায় গিয়ে হামলা চালিয়ে একটি মন্দির ও বাড়িতে আগুন দেয়। এসময় তারা যাকেই পেয়েছে তাকেই মারধর করেছে।
লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ পরিকল্পিত : দীঘলিয়ার ব্যবসায়ী কুমারেশ সাহা ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাগরিবের আজানের কিছু পরে কয়েকজন আমাদের বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে। সে সময় আমি টিউবওয়েলের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। এসেই তারা আমাকে মারধর শুরু করে। এরা এলাকার কেউ না। অপরিচিত লোক, বাইরে থেকে এসেছে। সেখানে ছিলেন আমার বড় ভাই আখড়বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, তিনি আমাকে রক্ষা করতে এলে হামলাকারীরা তাকেও বেদম প্রহার করে। তার মাথায় পাঁচটি সেলাই লেগেছে।’
কুমারেশ সাহা ও দীঘলিয়ার দুজন ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বাজারে হিন্দুদের পাঁচটি দোকান লুট করেছে হামলাকারীরা। এর মধ্যে দুটি মিষ্টির দোকান, একটি ওষুধের দোকান ও দুটি মুদি দোকান। এসব দোকানের ক্যাশবাক্স ভেঙে নগদ অর্থ নিয়ে গেছে তারা।
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দীঘলিয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক দিলীপ সাহার বাড়িতে লুটপাট করেছে হামলাকারীরা। এ সময় তারা দিলীপ সাহাকে মারধর করে। দিলীপ সাহার ভাই গোবিন্দ সাহার বাড়িতেও হামলা হয়েছে। তার বাড়িতে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। এ সময় তারা ঘর থেকে স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ লুট করে নিয়ে গেছে বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন।
রাতের দিকে লোকজন সাহাপাড়ার গোবিন্দ সাহা, তরুণ সাহা, দিলীপ সাহা, পলাশ সাহার বাড়ি এবং বাজারের নিত্য দুলাল সাহা, অনুপ সাহা, অশোক সাহা, সনজিৎ সাহার মুদি দোকান এবং গোবিন্দ কু-ু ও গৌতম কু-ুর মিষ্টির দোকান ভাংচুর ও লুটপাট করে। এসময় গোবিন্দ সাহার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। গোবিন্দ সাহার বাড়িটি আগুনে সম্পন্ন পুড়ে গেছে।
দীঘলিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য প্রভাত কুমার ঘোষ হিন্দুদের বাড়িঘর, দোকানপাট ও মন্দিরে হামলা ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
হামলাকারীরা অসংখ্য ও বড় অংশ বহিরাগত: শুক্রবারের হামলার বর্ণনা দিয়েছেন দুজন প্রত্যক্ষদর্শী। তারা পরিচয় গোপন রেখে দেশ রূপান্তরকে বলেন, হামলাকারীরা সংখ্যায় অনেক ছিল। এদের অধিকাংশকে তারা চিনতে পারেননি। তারা আশপাশের দূরের গ্রাম কুমড়ি ও মাওলি থেকে এসেছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। দীঘলিয়া বাজারসংলগ্ন সাহাপাড়া ছাড়াও বাজারের পশ্চিম ও উত্তর পাশে মুসলমানদের বাস। বহু বছর ধরে সেখানে তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করে আসছে। এ ধরনের ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি।
তারা আরও বলেন, গত ইউনিয়ন নির্বাচনে সরকারি দলের মনোনীত প্রার্থী হেরে যায়। বিদ্রোহী প্রার্থীর জয়ী হওয়ার জন্য হিন্দু ভোটকে দায়ী করা হয়। সে কারণে একটা ক্ষোভ ছিল। যারা হামলাকারী তাদের স্থানীয় লোকজন কেউ চেনে না। এই গ্রামের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও নেই। ফলে এই হামলাকে স্থানীয়রা পরিকল্পিত মনে করছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ওই দুজন আরও বলেন, জুমার নামাজের পর থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়। সেখানে পুলিশ এসেছিল। কিন্তু হামলাকারীদের তারা নিবৃত্ত করতে পারেনি। এরপর কয়েক দফা হামলা হয়। হামলা চলে রাত পর্যন্ত। এ সময় আতঙ্কিত হিন্দু পরিবারের অনেকে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয়।
লুটপাট ও হামলায় মামলা হয়নি: হিন্দু বাড়িতে হামলা ও তাদের দোকানপাট লুটের ঘটনায় গতকাল শনিবার পর্যন্ত লোহাগড়া থানায় কোনো মামলা হয়নি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার ও আটক করেনি। তবে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলার প্রস্তুতি চলছে। সরকারের উপরের মহলের নির্দেশ পেলে মামলা হতে পারে।
আমাদের নড়াইল প্রতিনিধি জানান, লোহাগড়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হারান চন্দ্র পাল (ওসির দায়িত্বে) বলেছেন, এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে শটগানের ফাঁকা গুলি করা হয়। পুরো এলাকায় পুলিশ টহল দিচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক লোকজন ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে। ছেলেটির বাবাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ছেলেটি পালিয়ে গেছে। তাকে ধরার চেষ্টা চলছে।
পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী কাজ করছে। ফেইসবুক পোস্টে ধর্ম অবমাননার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।