রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ওমর ফারুক চৌধুরীই গোদাগাড়ীর রাজাবাড়ি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. সেলিম রেজাকে মারধর করেছিলেন বলে দাবি করেছেন রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ। গতকাল শনিবার সকালে রাজশাহী নগরীর লক্ষ্মীপুরে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন দাবি করেন। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের একটি অডিও ক্লিপ শুনিয়ে অডিওর কথাগুলো অধ্যক্ষ সেলিম রেজার বলে উল্লেখ করেন। যে অডিওতে তাকে (অধ্যক্ষ) বলতে শোনা যায়, মারার সময় ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘এই, হকিস্টিক নিয়ে আয়। শালাকে হকিস্টিক দিয়ে মেরেই ফেলব।’
গত ৭ জুলাই অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে পেটানোর অভিযোগ ওঠার পর গত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করেন এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী। সেখানে তিনি অধ্যক্ষকে মারপিটের অভিযোগ অস্বীকার করে অপপ্রচারের অভিযোগ তোলেন। এর পেছনে আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামান আসাদের ইন্ধন রয়েছে বলে দাবি করেন এমপি। এই অভিযোগের প্রতিবাদে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করেন রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ। সংবাদ সম্মেলনে আসাদ বিস্তর অভিযোগ তুলে ধরেন ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে। অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে ফারুক চৌধুরী নিজেই মেরেছেনÑ অধ্যক্ষের এমন কথিত কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ সাংবাদিকদের শোনান আসাদ। ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে আরও বিভিন্ন অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি।
গত বুধবার সংবাদমাধ্যমে ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে অধ্যক্ষকে মারপিটের খবর প্রকাশ হয়। এসব প্রতিবেদনে ওমর ফারুক চৌধুরীর বেপরোয়া লাথি, কিল-ঘুষি ও হকিস্টিকের আঘাতে গোদাগাড়ীর রাজাবাড়ি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজার শরীরের বিভিন্ন স্থানে কালশিরা জমেছে বলে উঠে আসে; যা নিয়ে দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়।
এর প্রতিবাদ জানিয়ে ১৪ জুলাই ওমর ফারুক চৌধুরী রাজশাহী নগরীর নিউমার্কেট এলাকায় নিজস্ব রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে রাজাবাড়ি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজা উপস্থিত ছিলেন। ওমর ফারুক চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সেদিন আমি অধ্যক্ষ সেলিমকে মারধর করিনি। শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধক্কি শুরু হলে আমি নিজে গিয়ে তাদের নিবৃত করি।’
এ ছাড়া অধ্যক্ষ সেলিম রেজা নিজেও সাংবাদিকদের বলেন, সেদিন এমপি তাকে মারধর করেননি। এ সময় ওমর ফারুক চৌধুরী দাবি করেন, আওয়ামী লীগ নেতা আসাদ এসব সংবাদ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়াচ্ছেন।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ নেতা আসাদ গতকাল সকালে সাংবাদ সম্মেলনে আসেন। সেখানে অধ্যক্ষ সেলিম রেজা এমপির হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন এবং সেদিনের ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে জেলা আওয়ামী লীগের কোনো এক নেতার সঙ্গে তার (অধ্যক্ষ) কথোপকথনের কথিত অডিও রেকর্ড সাংবাদিকদের শোনান।
আসাদ বলেন, ‘এমপির হাতে মারধরের শিকার হয়ে অধ্যক্ষ সেলিম রেজা তাকে ফোন করে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। শরীরে আঘাতের ক্ষতও দেখিয়েছেন অধ্যক্ষ। এ সময় তিনি এক ব্যক্তির সঙ্গে অধ্যক্ষের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড বাজিয়ে সাংবাদিকদের শোনান। কার সঙ্গে এ কথা হচ্ছে জানতে চাইলে আসাদ বলেন, ‘সেটা এখন বলছি না।’
ওই অডিওতে শোনা যায়, অধ্যক্ষ অন্যজনকে বলছেন, সেদিন এমপির অফিসে যাওয়ার জন্য অধ্যক্ষ আবদুল আউয়াল রাজু অন্য অধ্যক্ষদের ডেকেছিলেন। যার সঙ্গে কথোপকথন, সেই ব্যক্তি অধ্যক্ষকে প্রশ্ন করেন, তারপরে আপনি গেলেন? অধ্যক্ষ বলেন, ‘হ্যাঁ গেলাম। আমি তো এমনি যাই না, ডাকলে যাই। অন্যরা সাত দিনের তিন দিনই দেখা করে। আমি আর চব্বিশনগরের প্রিন্সিপাল হাবিব ভাই না ডাকলে, কোনো মিটিং না হলে যাই না। এটাও আবার রাগ। সেদিনও আমি আর হাবিব ভাই একসঙ্গে গেছি। এই দুইটা লোক ছাড়া ভাই সবাই ওর (এমপির) পা চাটা।’
অন্য ব্যক্তি প্রশ্ন করেন, ওখানে যাওয়ার পরে? অধ্যক্ষ বলেন, ‘ওখানে যাওয়ার পরে বিড়ইলের মজিবর ছিল। ওই যে স্কুল এমপিওভুক্ত হলো। ওরা ফুলটুল নিয়ে গেছে। ওখানে সেক্রেটারি রশিদ ভাই (গোদাগাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রশিদ) ছিল। ওরা বেরিয়ে আসল। আমরা বসে ছিলাম। ৫-৭ মিনিট। তারপরে রশিদ ভাইয়ের সাথে হ্যান্ডসেক হলো। কথাবার্তা হলো। ওটা ওমর প্লাজার পূর্বপাড়ে।’
‘তখন রাজু এসে বলছে, এই এমপি উঠে যাবে। ঢোকেন, ঢোকেন, ঢোকেন। সব ঢুকে গেলাম। ঢুকতেই প্রথম কথা। আমাকে বলছে, সেলিম, তোমার কলেজে কী হয়েছে? আমি বলছি, কই স্যার? কিছু তো হয়নি। তখনই গালি ...তোর অফিসে বসে আমার নামে, রাজুর পরিবার নিয়ে, আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলিস, টিচাররা কথা বলে। তুই আমাকে না বলে, ওই টিচারদের বিচার না করে...এই উঠে এসেই মনে করেন যে কিল, ঘুষি লাথি।’
অধ্যক্ষ বলেন, ‘বারবার উঠছে-বসছে, মারছে। হকিস্টিক ডেকে নিয়ে আসছে। পর্দা টেনে দিল। প্রিন্সিপালকে দিয়েই পর্দা টানাইছে। রাজু পর্দা টেনে দিল। দিয়ে বলছে, এই হকিস্টিক নিয়ে আই। শালাকে হকিস্টিক দিয়ে মেরেই ফেলব। শালাকে আজ মেরেই ফেলব, শালা আমার বিরুদ্ধে কথা বলে।’
এই কথোপকথনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল সকালে অধ্যক্ষ সেলিম রেজার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। দুপুরে তার মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে। বিকেলেও তার ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে অধ্যক্ষকে পেটানোর অভিযোগ গত বৃহস্পতিবার থেকেই সরেজমিনে তদন্ত করছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। গতকাল কমিটির প্রধান জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল-হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়টা আমরা সিরিয়াসলি তদন্ত করছি। তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। আমরা কাজ করছি।’
এ পর্যন্ত তদন্তে কী পাওয়া যাচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তদন্তের স্বার্থে এখনই বলছি না। তবে এটুকু বলতে পারি তদন্ত প্রতিবেদনে ভালো কিছুই উঠে আসবে। সঠিক বিষয়টা থাকবে।’