সুনামগঞ্জ পৌরশহরের নবীনগর এলাকার বাসিন্দা এসএসসি পরীক্ষার্থী জয়া দাস। গত ১৯ জুন শুরু হওয়ার কথা ছিল তার পরীক্ষা। সে অনুযায়ী জোর প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন, কিন্তু ১৬ জুন মুহূর্তে বন্যার পানিতে পুরো ঘর ডুবে গেলে জীবন বাঁচাতে সব ফেলে ঘর ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন আশ্রয়কেন্দ্রে। ঘরের অন্যসব জিনিসের সঙ্গে বানের পানিতে ডুবেছে জয়া দাসের বইপত্রও।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হঠাৎ করেই ঘরের ভেতর বুকসমান পানি, তখন জীবন বাঁচাতে ঘর ছেড়েছি। বইপত্র কিছুই নিতে পারিনি, সব ভেসে গেছে পানিতে। এখন সামনে পরীক্ষার জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেব তা ভেবে কূল পাচ্ছি না।’
টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট সাম্প্রতিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জের মানুষের। রাস্তাঘাটের পাশাপাশি প্লাবিত হয় হাজার হাজার বসতঘর। ভয়াবহ এই বন্যায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ঘরের মালামাল ও খাদ্যশস্য নষ্ট হয়। আর বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি, আসবাবপত্রই শুধু ডোবেনি, ডুবেছে লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর বইপত্রও। তবে বইপত্র নষ্ট হয়ে যাওয়া এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে এখন সবচেয়ে দুশ্চিন্তায় আছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। বন্যা পরিস্থিতিতে ১৯ জুনের পূর্বনির্ধারিত এসএসসি পরীক্ষা স্থগিত হলেও আগামী আগস্ট মাসে সেই পরীক্ষা শুরুর ঘোষণায় দিশেহারা জেলার ২৮ হাজার ২০৫ জন এসএসসি পরীক্ষার্থী। বিশেষ করে নতুন করে বইসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ কেনার সামর্থ্য না থাকায় দরিদ্র পরিবারের পরীক্ষার্থীরা আছে বেশি বিপদে।
সুনামগঞ্জ পৌরশহরের নবীনগর এলাকারই আরেক এসএসসি পরীক্ষার্থী জিহান আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পানিতে বইয়ের সঙ্গে আমার পরীক্ষার প্রবেশপত্রও ভেসে গেছে। এখন পরীক্ষার হলে কেমনে যাব?’
মেহেদী হাসানেরও একই অবস্থা। তারও সব বইপত্র পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। বাজারে দোকানপাট খোলার সঙ্গে সঙ্গে বাবা আবদুস সামাদ বই কিনতে গিয়েছিলেন। লাইব্রেরিতে বই পেয়েছেন মাত্র একটি। তারা জানিয়েছে, বন্যায় তাদেরও বইপত্র নষ্ট হয়েছে। বই আসলে পাওয়া যাবে।
ছেলের পরীক্ষা নিয়ে দুচিন্তায় থাকা মেহেদীর বাবা আবদুস সামাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ছেলেটা মেধাবী। সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ে। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি দেবে। কিন্তু এখন তো পড়তেই পারছে না।’
একইভাবে উদ্বিগ্ন মেহেদীর মা মোহিতা বেগমও। তিনি বলেন, ‘বইগুলো খাটের ওপর চেয়ার তুলে তাতে রেখে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখন এসে দেখি সব নষ্ট হয়ে গেছে। ছেলেটার পড়াশোনা এতদিন হয়নি।’
বই না থাকায় পড়াশোনা বন্ধ আছে মেহেদী হাসানের প্রতিবেশী আরেক এসএসসি পরীক্ষার্থী প্রমা রানী দাসেরও। তিনি বলেন, ‘পড়াশোনা না হলে ফল তো ভালো হবে না।’
শুধু জয়া, মেহেদী আর জিহানই নয়, তাদের মতো বন্যায় আরও অনেক শিক্ষার্থীর বইপত্র নষ্ট হয়েছে। কারও কারও বইপত্র ভেসে গেছে বন্যার পানিতে। কেউ কেউ প্রবেশপত্র খুইয়েছে। এখন সামনে কীভাবে পরীক্ষা দেবে, প্রস্তুতির কী হবেÑএসব নিয়ে চিন্তিত তারা।
একই অবস্থা জেলার বেশিরভাগ অন্য শিক্ষার্থীদেরও। ঘরের সব হারিয়ে যখন আশ্রয়হীন, এমনকি সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে সেই চিন্তা যখন পুরো পরিবারের, তখন বইপত্র কেনা একদম অসাধ্য।
এদিকে ভয়াবহ বন্যার এক মাস পর আজ রবিবার থেকে খুলছে জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো বন্যার্ত মানুষ আশ্রয়ে থাকায়, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, বহু শিক্ষার্থীর বাড়িঘর মেরামত না হওয়ায় এবং বইপত্র না থাকায় সব শিক্ষার্থী ফিরতে পারবে না স্কুলে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও সহসাই স্বাভাবিক হচ্ছে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান ও পরীক্ষা কার্যক্রম।
এ প্রসঙ্গে জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দিগেন্দ্র বর্মণ সরকারি কলেজের শিক্ষক মো. মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা এমনিতেই বিপর্যস্ত। এক ভয়ংকর পরিস্থিতি দেখেছে তারা। এই সমস্যা শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি হবে। কারণ গ্রামে শিক্ষার্থীদের বইপত্র সংরক্ষণের সুবিধা কম। এমনিতেই এসএসসি পরীক্ষার্থীদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। এখন দ্রুত তাদের বইপত্রের সুবিধা দিয়ে আবার পড়াশোনা স্বাভাবিক করতে শিক্ষা প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মাধমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০ হাজার বই চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। রবিবার (আজ) স্কুল খোলার পর ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের আরও হিসাব পাওয়া যাবে।’
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী জেলায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী এবং এসএসসি পরীক্ষার্থীদের তালিকা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী সপ্তাহেই চট্টগ্রাম থেকে শিক্ষার্থীদের সব বই পৌঁছে যাবে। সব শিক্ষার্থীকে বইপত্রসহ সব ধরনের সহযোগিতা করা হবো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু হলে পরে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বই পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’