পাউবোর জমিতে আ.লীগ নেতার হোটেল, উদ্বোধন এমপির

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জায়গা দখল করে হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও কমিউনিটি সেন্টার গড়ে তুলেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিক শ্যামল। আর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনা তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে তোলা এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো সম্প্রতি ঘটা করে উদ্বোধন করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও লালমনিরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোতাহার হোসেন। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ খোদ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও। 

হাতীবান্ধা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিক শ্যামল লালমনিরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য মোতাহার হোসেনের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মোতাহার হোসেন কলেজের অধ্যক্ষ। এছাড়াও তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এবং গড্ডিমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। পাউবো কর্মকর্তাদের শত নিষেধ উপেক্ষা করে হাতীবান্ধার দোয়ানী এলাকায় তিস্তা ব্যারেজের পাশে ফ্লাড বাইপাস সড়কের কোল ঘেঁষে প্রায় ৩০ শতাংশ সরকারি জমির ওপর দুটি বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করেছেন তিনি। সেগুলো হলোÑ বৈরালী ফাস্টফুড চাইনিজ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড কমিউনিটি সেন্টার এবং হোটেল বৈরালী।

হাতীবান্ধা থানায় জমা দেওয়া পাউবোর লিখিত অভিযোগ থেকে জানা গেছে, গত বছরের মাঝামাঝি তিস্তা ব্যারেজ এলাকার পাঁচ নম্বর চেকপোস্টের বিপরীত পাশে ফ্লাড বাইপাসের একশ’ গজ দূরে পাউবোর অধিগ্রহণ করা জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু করেন আওয়ামী লীগ নেতা আবু বক্কর সিদ্দিক শ্যামল। কাজ শুরুর ঘটনা জানার পরপরই পাউবো কর্মকর্তারা তাকে নির্মাণকাজ বন্ধ করতে মৌখিক নির্দেশ দেন। তবে তাতে কাজ বন্ধ হয়নি। এরপর ওই বছরের ১১ ও ২৫ আগস্ট পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (অতি. দায়িত্ব) মো. রাশেদীন অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে পরপর দুটি নোটিস দেন। এতেও কাজ না হলে হাতীবান্ধা থানায় গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর লিখিত অভিযোগ জমা দেন পাউবোর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আব্দুর রউফ।

এছাড়া নীলফামারী পাউবোর (ডালিয়া) নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদদৌলা তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা শ্যামলের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসককে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানান। অবশ্য ওই চিঠিটির পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি জেলা প্রশাসন, একদিনের জন্যও বন্ধ থাকেনি নির্মাণকাজ। এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নেতার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের অনুরোধ জানিয়ে গত ৬ জুন ফের লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসককে চিঠি পাঠানো হয় পাউবোর পক্ষ থেকে। কিন্তু অজানা কারণে এই দফায়ও জেলা প্রশাসন চুপ থাকে। আর এরইমধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে ঘটা করে আওয়ামী লীগ নেতার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্বোধনের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। যার ধারাবাহিকতায় গত ৭ জুলাই বৈরালী ফাস্টফুড চাইনিজ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড কমিউনিটি সেন্টার এবং হোটেল বৈরালীর ব্যবসায়ী কার্যক্রম শুরু হয়।

সম্প্রতি তিস্তা ব্যারেজের দোয়ানী এলাকার একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে পাউবোর জায়গায় অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করে বসবাস করে আসছেন। তবে তারা পাউবোর জায়গায় স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের সাহস পাননি। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক শ্যামল পাউবোর জায়গা দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় তারা হতবাক।

শত নিষেধ উপেক্ষা করে পাউবোর জায়গায় আওয়ামী লীগ নেতা শ্যামল অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলায় ক্ষুব্ধ খোদ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও। এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাতীবান্ধা উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর মধ্যে তিস্তা ব্যারেজ একটি। সেই ব্যারেজের জমি দখলে নিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন আওয়ামী লীগ নেতা। আবার অবৈধভাবে গড়ে তোলা সেই প্রতিষ্ঠান ঘটা করে উদ্বোধন করলেন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও এলাকার সংসদ সদস্য। এটা আমাদের জন্য চরম লজ্জার।’

পাউবোর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আব্দুর রব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিস্তা ব্যারেজ ও ফ্লাড বাইপাস সড়কের আশপাশে কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি নেই। পাউবোর জায়গায় কিছু ভূমিহীন অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। কিন্তু কেউ স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবেন না।’

আওয়ামী লীগ নেতা শ্যামলের দখলদারিত্ব ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (ডালিয়া) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদদৌলা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসককে দুই দফায় চিঠি দিয়েও দখলদারদের উচ্ছেদ করতে পারছি না। এটি আমাদের জন্য বড়ই পরিতাপের বিষয়। তবে দখলদাররা যতই ক্ষমতাশালী হোক না কেন উচ্ছেদ করা হবেই।’

পাউবোর জায়গায় আওয়ামী লীগ নেতা শ্যামলের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য অনুরোধ করে পাঠানো চিঠি পাওয়া গেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

এদিকে পাউবোর জায়গায় আওয়ামী লীগ নেতা শ্যামলের অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা ঘটা করে উদ্বোধনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল শনিবার সংসদ সদস্য মোতাহার হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

উল্লেখ্য, পাউবোর জায়গায় আওয়ামী লীগ নেতা শ্যামলের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর দৈনিক দেশ রূপান্তরে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল।