স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণপরবর্তী সময়ে শিল্পপণ্য রপ্তানি বাড়াতে সরকারের দেওয়া নগদ সহায়তা ও সুবিধাগুলো ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করে নিতে হবে বাংলাদেশকে। সে রকম পরিস্থিতিতে বিশ^বাজারে রপ্তানি কমে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় রপ্তানির ধারা অব্যাহত রাখতে প্রণোদনার বিকল্প উপায় খোঁজার পরামর্শ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
এছাড়া হারমোনাইজড সিস্টেম (এইচএস) কোড ও নগদ সহায়তা তুলে নেওয়ার ফলে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা ও রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগগুলোও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। রপ্তানি সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য করা সুপারিশে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
বর্তমানে রপ্তানি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করার জন্য সরকার ৪২টি খাতে রপ্তানি প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা দিয়ে থাকে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণপরবর্তী সময়ে রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতা মোকাবিলার লক্ষ্যে সরাসরি রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা চিহ্নিত করা এবং এসব ভর্তুকি কার্যক্রম বিশ^ বাণিজ্য সংস্থার সংশ্লিষ্ট বিধানগুলোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ থাকবে কি-না তা নিরূপণ করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ৬টি উপ-কমিটি করা হয়েছে। এসব কমিটির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ ও শুল্ক যৌক্তিকতাবিষয়ক উপ-কমিটি। সিনিয়র সচিবের নেতৃত্ব একটি সাবসিডিবিষয়ক স্টাডি গ্রুপ গঠন করে অর্থ বিভাগ এসব সুপারিশ করেছে। বিশ^ বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শুল্ক ও কোটামুক্ত জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে।
ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা মোকাবিলা করার জন্য বিকল্প কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় সে বিষয়ে এখনই উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি বলে মনে করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এজন্য এখনই রপ্তানির প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সাহায্য করতে কয়েকটি সুপারিশ করেছে অর্থ বিভাগ। এসব সুপারিশ গত ৭ জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বর্তমানে রপ্তানি প্রণোদনা দিতে পারে। তবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণপরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ২০২৬ সালের পর শিল্পপণ্যের রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো রকম নগদ সহায়তা দিতে পারবে না। তৈরি পোশাক খাতে কিছু এইচএস কোডে বাংলাদেশ ৮ বছরেরও বেশি সময় আগে প্রতিযোগিতামূলক সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করে। বাংলাদেশকে সেই এইচএস কোডের অধীনে থাকা পণ্যের রপ্তানি প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা ধাপে ধাপে হ্রাস করতে হবে।
স্বল্পোন্নত দেশগুলো রপ্তানি পরিমাণের ওপর ভর্তুকি এবং একে অপরের সঙ্গে চুক্তি ব্যবস্থা সংযুক্তি-৭ অনুযায়ী ২০টি দেশ রপ্তানি ভর্তুকি দিতে পারবে। তবে সংযুক্তি-৭-এ উল্লিখিত কোনো উন্নয়নশীল দেশের এক বা একাধিক পণ্যের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এইচএস কোড পর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারের মোট রপ্তানির হিসেবে ওই ২০ দেশের মধ্যে কোনোটির রপ্তানি ৩ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছালে ৮ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে সেই পণ্যগুলোর ওপর ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে হবে। কোনো সদস্য দেশ পণ্য উৎপাদনে আমদানিকৃত পণ্যের বিপরীতে দেশীয় পণ্য ব্যবহারের শর্তারোপ করে কোনো ভর্তুকি দিতে পারবে না।
এছাড়া বাংলাদেশ প্রকৃত খাদ্য আমদানিকারক দেশ হিসেবে বিবেচিত হলে কৃষিপণ্যেও রপ্তানির ওপর ২০৩০ সাল পর্যন্ত নগদ সহায়তা দিতে পারবে। এজন্য প্রকৃত খাদ্য আমদানিকারক দেশের স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য ২০২৬ সালের শুরুতেই বিশ^ বাণিজ্য সংস্থার কাছে আবেদন করতে হবে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ব বাজারে রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে ব্যবসা সহজ করার দিকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া উচিত। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর নগদ সহায়তা বা প্রণোদনা বন্ধ করলেও সামগ্রিকভাবে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না।’