দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সংকট

করোনা মহামারীর কারণে ২০২০ সালের প্রথম থেকেই টালমাটাল ছিল বৈশ্বিক অর্থনীতি। সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউন দেওয়ায় প্রায় প্রতিটি দেশেই বন্ধ ছিল উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানি। ফলে অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়ে বিভিন্ন দেশ। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসায় ২০২১ সালের মাঝামাঝি অর্থনীতির চাকা স্বাভাবিক হয়ে এলেও সেই গতিতে বাদ সেধেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। মস্কো-কিয়েভ সংঘাতের প্রভাব পড়েছে খাদ্য, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম এবং জাহাজ ভাড়ায়। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে তেল, গ্যাস ও খাদ্যশস্য আমদানিনির্ভর দেশগুলো। পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুই যেন হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিতিশীল অবস্থার সবচেয়ে বেশি দায়ভার বহন করতে হচ্ছে বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে। কিন্তু এই অবস্থা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে শুধু স্বল্পোন্নত নয়, ধনী দেশগুলোও ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়বে বলে শঙ্কা বিশ্লেষকদের।

চরম মুদ্রাস্ফীতি বর্তমান বিশ্বের নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি এশিয়ার দেশগুলোসহ পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইউক্রেন সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি, খাদ্য ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি চলমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতি দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে এবং এর কুফল ভোগ করছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। এরই মধ্যে এ অঞ্চলের অনেক দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার নতুন রেকর্ড গড়েছে। এপ্রিল মাসে লাওসে এই হার ৯ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়, আর ইন্দোনেশিয়ায় পাঁচ বছরের সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। মার্চ মাসে সিঙ্গাপুরের মুদ্রাস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছায়, যা ১০ বছরে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি এবং ১৪ বছরের সিপিআই রেকর্ডের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। আর থাইল্যান্ডে আগের বছরের তুলনায় মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এপ্রিল মাসে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বছর প্রতি সিপিআই বৃদ্ধির পরে ফিলিপাইন ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের পর সবচেয়ে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির শিকার হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলোর পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো মনে হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে অদূর ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতি নতুন রেকর্ড গড়বে। তথ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ফোকাস ইকোনমিকসের মতে, এই অঞ্চলের মুদ্রাস্ফীতির হার ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৩ শতাংশ, যা মার্চে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ দেশই হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে সামগ্রিক জাতীয় ব্যয়ের অপেক্ষাকৃত বড় অংশ জুড়ে রয়েছে খাদ্যের জন্য বরাদ্দ করা ব্যয়। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির উচ্চঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির হার স্বাভাবিকভাবেই দুঃসহ স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধি এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির পরে এশিয়ার আর্থিক সংকট দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। বৈদেশিক মুদ্রা ও শেয়ারবাজারে ডমিনোদের মতো একের পর এক পতন ঘটতে থাকে। ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। দুই বছরের মধ্যে তাদের জিডিপি যথাক্রমে ৮৩ দশমিক ৪ শতাংশ ও ৪০ শতাংশ হ্রাস পায়। এরপর ২০০৮ সালে মার্কিন মুলুকের সাবপ্রাইম মর্টগেজ সংকট সারা বিশ্বে আর্থিক সংকট তৈরি করে। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থা আবারও নড়বড়ে করে দেয়। সিঙ্গাপুর স্ট্রেট সূচক ৪৫ শতাংশের বেশি কমে যায়। একটানা ভয়াবহ দরপতনের পর ইন্দোনেশিয়ার শেয়ারবাজারের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বাধাগ্রস্ত হয়। তা ছাড়া ফিলিপাইনের ৮০ লাখের বেশি বিদেশি কর্মী চাকরিচ্যুতি এবং আয় হ্রাসের ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। আর থাইল্যান্ডের প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক বেকারত্বের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করে।

এ তো গেল আগের কথা। এখন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অদূরদর্শিতা বিভিন্ন দিক থেকে আবারও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এই হার বৃদ্ধির ফলে অর্থায়ন ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে এবং ক্যাপিটাল ফ্লাইটের সম্ভাবনা তৈরি হবে। উভয়ই উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলোকে প্রভাবিত করবে এবং এসব দেশের কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ জটিল করে দেবে এবং মার্কিন ডলারের উচ্চমূল্য ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর বোঝা আরও ভারী করবে, কারণ, অনুন্নত দেশের বৈদেশিক ঋণের অনুপাত সাধারণত বেশি থাকে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলার সূচকের ক্রমবৃদ্ধি অন্যান্য মুদ্রার ওপর অবমূল্যায়ন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এভাবে অন্যান্য দেশে আরও বেশি মুদ্রাস্ফীতি ঘটতে পারে। যেহেতু চরম মুদ্রাস্ফীতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভয়াবহ দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই এর দায় নিতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে এই অভূতপূর্ব পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে এবং এর প্রভাব প্রশমিত করতে নিজেদের প্রস্তুত করার ব্যাপারে বিশেষভাবে সচেতন হতে হবে। কিছু পর্যবেক্ষকের দাবি বর্তমান মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির নেপথ্য কারণ চাহিদা নয়, বরং তা জোগানের কারণে ঘটছে। বিশেষ করে কভিড-১৯ মহামারী দ্বারা প্রাথমিকভাবে শুরু হওয়া বাধা, পরবর্তী সময়ে সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘিœত হওয়া। ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের কারণে যা আরও বেড়েছে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন থাইল্যান্ডের ব্যবসায়ীরাও। রাশিয়ার বাজারে প্রবেশাধিকার হারিয়ে ফেলেছেন তারা। থাইল্যান্ডের ফল এবং শাকসবজি রপ্তানির বড় বাজার রাশিয়া। থাইল্যান্ডের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাশিয়ায় পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে ফেব্রুয়ারিতে থাইল্যান্ডে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ, যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

১৯৭০ সালের পর ২০২২ সালেই বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বড় মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বের ৪৫টি দেশ তাদের মুদ্রার মূল্যমান কমিয়েছে। এ ছাড়া বেশ কিছু দেশ সুদের হার আরও বাড়িয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যের মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশে পৌঁছায়। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শঙ্কা আসন্ন শরতে সেই হার ১২ শতাংশ ছাড়াবে। আর্জেন্টিনায় জীবনযাপন ব্যয় বেড়েছে ৭০ শতাংশ। এ রকম চলতে থাকলে বছর শেষে দেশটির মুদ্রাস্ফীতি ৬০ শতাংশ ছুঁতে পারে। আর্জেন্টিনার ৪৩ শতাংশ মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমায়, ২০ লাখ মানুষ খাবারের জন্য ফুড ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ফুড ব্যাংকের খাবারও ফুরিয়ে গেছে। তাই মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছে, প্রতিবাদ করছে। বেলজিয়ামে জীবনযাপন ব্যয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বেতন বাড়ানোর দাবিতে ৭০ হাজার শ্রমিক আন্দোলনে নামলে তাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ভারতেও বাড়ছে মুদ্রাস্ফীতি। দেশটির মুদ্রাস্ফীতির হার এরই মধ্যে ৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। সামনের মাসেই এটা ৮ শতাংশ ছাড়াতে পারে। ভেনিজুয়েলা বিশ্বের সবচেয়ে তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে একটি, যা এর উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির গতিপথের পেছনেও একটি কারণ।  তুরস্কে গত মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৭৩.৫ শতাংশে পৌঁছায়। তুরস্কের পপুলিস্ট নেতা রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের অর্থনীতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে, লিরা ভেঙেছে এবং দেশের জনগণকে ক্ষুব্ধ করেছে। আর্জেন্টিনা এবং সুরিনাম, দক্ষিণ আমেরিকার এ দুটি দেশেও মূল্যস্ফীতির হার ৫০ শতাংশের ওপরে। এদিকে, শ্রীলঙ্কায়, যেখানে অর্থনৈতিক সংকট দেশজুড়ে বিক্ষোভের সূত্রপাত করেছে, সর্বশেষ মূল্যস্ফীতির হার ৫৪.৬ শতাংশ বলে জানা গেছে।

এদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৪০ ডলারে পৌঁছায়। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং পণ্য সরবরাহ সংকট নতুন হুমকির মুখে ফেলেছে বিশ্ববাসীকে। রাশিয়ার তেল, গ্যাস এবং কয়লা আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ফলে তেলের দাম আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাস সরবরাহকারী এবং তৃতীয় বৃহত্তম তেল সরবরাহকারী দেশ রাশিয়া। দেশটি থেকে আমদানি করা তেল এবং গ্যাসের ওপর নির্ভর করে এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতিগুলো। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন হংকংয়ের বিশেষজ্ঞ টমি উ। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্ব থেকে রাশিয়া বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও সুসম্পর্ক বজায় থাকবে চীনের সঙ্গে। ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি চীনের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব বাড়াবে। কিন্তু তাতে বিশে^র দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সংকট কাটবে না।

লেখক গবেষক ও কলামিস্ট

raihan567@yahoo.com