এমপির মারধর দেবীদ্বারে ক্ষোভ বিক্ষোভ সংঘর্ষ

কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদকে পেটানোর পর সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের বিরুদ্ধে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেবীদ্বার। গত শনিবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সভায় একটি ইউনিয়ন কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মারধরের ঘটনা ঘটে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে শনিবার সন্ধ্যা থেকেই এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল রবিবারও পুরো উপজেলায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল।

শনিবার সন্ধ্যা থেকে উপজেলা চেয়ারম্যানের সমর্থকরা ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। অপরদিকে দেবীদ্বার-চান্দিনা সড়ক অবরোধ করা হয়। রাত পৌনে ৮টায় চেয়ারম্যানের সমর্থকরা দেবীদ্বার সদরে মিছিল বের করলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এতে উভয় পক্ষের মাহবুবুর রহমান, আবদুর রাজ্জাক, সাইফুল ইসলাম বাবু, মো. সুমনসহ অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার খাবর পাওয়া গেছে। এ সময় মুহুর্মুহু ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে।

দেবীদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ কমল কৃষ্ণ ধর বলেন, ‘এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। আমরা পুরো দেবীদ্বার পর্যবেক্ষণে রেখেছি। সংঘর্ষে কতজন আহত হয়েছে সে তথ্য এখনো পাইনি। পুলিশ সতর্ক অবস্থানে আছে।’

এদিকে উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদকে (৩৮) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেবিনে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে তাকে নিউরোসার্জারি বিভাগের ১০৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে তাকে কেবিনে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (ইন্সপেক্টর) মো. বাচ্চু মিয়া।

হাসপাতালে আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘২৬ বছর পর ২১ জুলাই দেবীদ্বার উপজেলা সম্মেলন হতে যাচ্ছে। গতকাল জাতীয় সংসদের এলডি হলে দেবীদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সভায় একটি ইউনিয়ন কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে এ হামলার ঘটনা ঘটে। কমিটি নিজের মনমতো না হওয়ায় এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে কিল-ঘুষি মারেন। নেতাকর্মীরা আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।’

তিনি আরও জানান, তার মাথায় ও কানে আঘাত রয়েছে। এ ঘটনায় মামলার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান তিনি।

২১ জুলাইয়ের সম্মেলন স্থগিত : দেবীদ্বার (কুমিল্লা) প্রতিনিধি জানান, ২১ জুলাইয়ের সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। শনিবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে দলের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সভায় স্থানীয় এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের মধ্যে হাতাহাতি ও কিল-ঘুষির ঘটনায় সম্মেলন স্থগিত করা হয়। গতকাল বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রোশন আলী মাস্টার।

তিনি বলেন, স্থানীয় এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের মাঝে সৃষ্টি হওয়া বিরোধ নিরসন না হওয়া পর্যন্ত সম্মেলন স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ও হুইপ শহীদুল হক স্বপন। তিনি আরও বলেন, দুজনের মাঝে সৃষ্টি হওয়া বিরোধ নিরসনের পর সুবিধাজনক সময়ে সম্মেলন হবে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২১ জুলাই দেবীদ্বার উপজেলা সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। ওই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে গত শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবে বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ম. রুহুল আমিন, সাধারণ সম্পাদক রোশন আলী মাস্টার, দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মনিরুজ্জামানসহ জেলা এবং উপজেলার প্রায় ২৬ নেতা উপস্থিত ছিলেন। তবে এতে উপস্থিত ছিলেন না প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা।

এমপি-চেয়ারম্যান হাতাহাতির জেরে উত্তপ্ত দেবীদ্বারসভার একপর্যায়ে উপজেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন সরকার দাবি তোলেন এলাহাবাদ ইউনিয়ন কমিটি ঘোষণা দেওয়ার। এ সময় সব সদস্য এক বাক্যে তা সমর্থন করলে কুমিল্লা (উত্তর) জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি রোশন আলী মাস্টার সাবেক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম সরকারকে সভাপতি হিসেবে এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আক্তারুজ্জামান স্বপনের নাম ঘোষণা করেন। ওই সময় কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল ‘কমিটি মানি না’ বলে ঘোষণা দেন। পাশে বসা দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ কুমিল্লা (উত্তর) জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবুল কালাম আজাদ ‘কমিটি সুন্দর হয়েছে’ বললে এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের মধ্যে হাতাহাতি হয়।

দেবীদ্বারে নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ : জাতীয় সংসদের এলডি হলে মারধরের খবর ছড়িয়ে পড়লে দেবীদ্বারের নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কুমিল্লা (উত্তর) জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হাজি আবুল কাসেম সওদাগর বলেন, ‘জাতীয় সংসদে বসে সংসদ সদস্যরা মানুষের জন্য আইন প্রণয়ন করেন আর আমাদের সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে মারামারি করেন।’ কুমিল্লা (উত্তর) জেলা সাধারণ সম্পাদক হাজি রোশন আলী মাস্টার বলেন, ‘আমরা বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের হাতে ২০০৪ সাল থেকে মার খেয়ে আসছি, এখনো মার খাচ্ছি। এমপি সাহেবের এ জঘন্য আচরণের বর্ণনা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। একজন জাতীয় সংসদ সদস্য একজন উপজেলা চেয়ারম্যানকে এভাবে লাঞ্ছিত করবেন, এটা কেউ প্রত্যাশা করেনি।’