মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন পেল বঙ্গভ্যাক্স

দেশি কোম্পানি গ্লোব বায়োটেকের তৈরি করোনার টিকা ‘বঙ্গভ্যাক্স’ মানুষের শরীরে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের অনুমতি দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। প্রাণীদেহে সফলভাবে ট্রায়ালের পর মানবদেহে ট্রায়ালের অনুমোদন পেল এ টিকা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬০ জনের ওপর প্রথম পর্যায়ে এ টিকা প্রয়োগ করা হবে। গতকাল রবিবার বঙ্গভ্যাক্সকে চিঠি দিয়ে অনুমোদনের বিষয়ে জানিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।

এ ব্যাপারে অধিদপ্তরের পরিচালক আইয়ুব হোসেন বলেন, ‘গ্লোব বায়োটেক তাদের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছিল। এজন্য তারা যে প্রটোকল জমা দিয়েছিল তা অনুমোদন হয়েছে। চিঠি দিয়ে অনুমোদনের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন তারা এ টিকার ফার্স্ট ফেজ ট্রায়াল করতে পারবে।’

এর আগে ২০২১ সালের ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা কাউন্সিল (বিএমআরসি) মানবদেহে বঙ্গভ্যাক্সের টিকা প্রয়োগের নীতিগত অনুমোদন দেয়। এর চার দিন পর ২৫ নভেম্বর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে আবেদন করে গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড। আবেদনের প্রায় সাড়ে সাত মাস পর অনুমোদন পেল প্রতিষ্ঠানটি। অনুমোদন পাওয়ায় গ্লোব বায়োটেকের হয়ে এখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করবে সিআরও (ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন) প্রতিষ্ঠান ক্লিনিক্যাল রিসার্স অর্গানাইজেশন লিমিটেড।

এ ব্যাপারে এই টিকার ট্রায়ালের প্রধান গবেষক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) হেপাটোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মামুন আল আহতাব বলেন, ‘বিএমআরসি, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছে। আমরা ফেজ ওয়ান বা প্রথম পর্যায়ের পরীক্ষা শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছি। আশা করি সেপ্টেম্বরে শুরু করতে পারব।’

এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ‘এখন কাঁচামাল আমদানি করে টিকা তৈরি হবে। টিকা তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্যেই টিকা প্রয়োগের জন্য স্বেচ্ছাসেবক বাছাই করা হবে। টিকা প্রয়োগ করা হবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ে। ৬০ জনকে দুই গ্রুপে ভাগ করা হবে। এক গ্রুপে থাকবেন ১৮-৫৫ বছর বয়সী এবং আরেকটি গ্রুপ ৫৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ। তাদের ওপর ট্রায়াল হবে। ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের দুই ডোজ টিকা দেওয়া হবে। প্রথম ডোজ টিকা দেওয়ার ২১ দিন পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে। টিকা দেওয়ার শুরু থেকে মোট ৩৫ দিনে এই পরীক্ষা শেষ হবে। প্রথম পর্যায়ের পরীক্ষা শেষে ফলাফল পর্যালোচনা করা হবে। তারপর দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা হবে। কবে নাগাদ ব্যাপক হারে মানুষকে এই টিকা দেওয়ার উপযুক্ত হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। ফেজ ওয়ান যদি সেফ এবং কার্যকর প্রমাণিত হয় তাহলে আমরা দ্বিতীয় ফেজের জন্য অ্যাপ্লাই করব।’

২০২১ সালের ২২ জুন বিএমআরসি মানবদেহে বঙ্গভ্যাক্সের পরীক্ষা চালানোর অনুমতি দেয়। যদিও এর আগে বানর বা শিম্পাঞ্জির দেহে পরীক্ষা করার শর্ত দেওয়া হয়। গত বছর ১ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটি বানরের দেহে ট্রায়াল শুরু করে, যা শেষ হয় ২১ অক্টোবর।

যেভাবে অনুমোদন পেল বঙ্গভ্যাক্স : করোনা মহামারী শুরুর পর গত ২০২০ সালের ২ জুলাই করোনা টিকার কাজ শুরুর কথা জানায় ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি গ্লোব ফার্মার সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক।

বানরের দেহে টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগে ‘ভালো’ ফল পাওয়ার কথা জানিয়ে গত বছর ১ নভেম্বর বিএমআরসিতে প্রতিবেদন জমা দেয় গ্লোব বায়োটেক। সেদিন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই প্রতিবেদন জমার মধ্য দিয়ে বিএমআরসির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পূর্বশর্তসহ সব পর্যবেক্ষণের যথাযথ উত্তর দেওয়া শেষ হয়েছে।

গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে অনুমোদনের ব্যাপারে বিস্তারিত জানান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. হারুনুর রশিদ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিএমআরসির নির্দেশনা অনুসারে বানরের দেহে চালানো বঙ্গভ্যাক্স পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কিত প্রতিবেদন গত বছর ১ নভেম্বর বিএমআরসিতে জমা দেওয়া হয়। পরে বিএমআরসির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের শর্তসহ সব পর্যবেক্ষণের যথাযথ উত্তর দেওয়া শেষ হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ২১ নভেম্বর বিএমআরসির ন্যাশনাল রিসার্চ এথিক্স কমিটির সভায় মানবদেহে বঙ্গভ্যাক্স পরীক্ষার নৈতিক অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় এবং ২৩ নভেম্বর অনুমোদন দেওয়া হয়। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ২৫ নভেম্বর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে আবেদন করে গ্লোব কর্র্তৃপক্ষ। সে পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন দেয়। পরে চূড়ান্তভাবে গতকাল বঙ্গভ্যাক্সের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমতি দেওয়া হয়।

শতভাগ কার্যকর বঙ্গভ্যাক্স : গতকালের বিজ্ঞপ্তিতে গ্লোব বায়োটেকের পক্ষ থেকে বলা হয়, করোনার ডেল্টা ধরনের মতো ওমিক্রন ধরনের বিরুদ্ধেও শতভাগ কার্যকর বঙ্গভ্যাক্স। পাশাপাশি করোনার প্রতিটি ভ্যারিয়েন্টের সিকোয়েন্স অ্যানালাইসিস করে বঙ্গভ্যাক্স ভ্যাকসিনের সিকোয়েন্স মিলিয়ে দেখা গেছে প্রতিটি ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রেই বঙ্গভ্যাক্স কার্যকর। এর প্রমাণ মিলেছে বানরের পরীক্ষায়। প্রাথমিক ফলাফলে ভ্যাকসিনটি বানরে নিরাপদ এবং কার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এরপর ভ্যাকসিনেটেড বানরে করোনাভাইরাসের ওমিক্রন-ডেল্টাসহ অন্যান্য ভ্যারিয়েন্ট প্রয়োগ করে চ্যালেঞ্জ স্টাডি করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ভ্যাকসিনে বানরের দেহে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, সেই অ্যান্টিবডি সাত দিনের মধ্যেই করোনাভাইরাসকে নিউট্রালাইজ করতে পেরেছে। অতএব চূড়ান্ত ফলাফলে এই ভ্যাকসিন বানরে সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং শতভাগ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের চেয়ারম্যান বলেন, উন্নত বিশ্ব করোনা মোকাবিলায় যে নতুন ভ্যাকসিনের কথা বলছে, আমরা মনে করি বঙ্গভ্যাক্স হতে পারে সেই নতুন ভ্যাকসিন। আমরা যদি এ টিকা মানবদেহে পরীক্ষা শেষে বাজারে আনতে পারি, তাহলে সারাবিশ্বে ওমিক্রন-ডেল্টাসহ করোনার অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের যে মহামারী চলছে বঙ্গভ্যাক্স তা থেকে পরিত্রাণ দিতে পারে। যেসব দেশে ইতিমধ্যে বিভিন্ন টিকা দেওয়া হয়েছে, সেসব দেশে বুস্টার ডোজ হিসেবেও বঙ্গভ্যাক্স দেওয়া যাবে।

বঙ্গভ্যাক্স টিকার বৈশিষ্ট্য : গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই টিকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর একটি ডোজেই অ্যানিমেল ট্রায়ালে কার্যকর অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালেও অনুরূপ ফলাফল পাওয়া যাবে। এটি +৪০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এক মাস এবং -২০০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ছয় মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। এটি সিন্থেটিক্যালি তৈরি হওয়ায় তা ভাইরাসমুক্ত এবং শতভাগ হালাল।