পুলিশ ছিল নীরব দর্শক সেই তরুণসহ গ্রেপ্তার ৪

পুলিশের সামনে মিছিলকারীরা মন্দিরে আগুন দিয়েছে। পুলিশের ভূমিকা ছিল নীরব দর্শকের মতো। আর নড়াইলের পুলিশ সুপার (এসপি) সারাদিন লোহাগড়া থানায় অবস্থান নিয়েছেন, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছেন আগুন, লুটপাট ও মারধর শেষ হওয়ার পর। গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার দীঘলিয়ায় হিন্দুদের ওপর আক্রমণের এমনই বর্ণনা দিয়েছেন ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত থাকা দুজন স্থানীয় সাংবাদিক।

হিন্দুদের বাড়ি, মন্দির ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, লুট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গতকাল রাতে লোহাগড়া থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে ফেইসবুক পোস্টে ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে কলেজছাত্র আকাশ সাহাকে (২০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে তাকে খুলনা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ তুলে দীঘলিয়ায় হিন্দুদের বেশ কয়েকটি বাড়ি,দোকানপাট ও একটি মন্দিরে ভাঙচুর এবং আগুন লাগিয়েছে ‘তৌহিদী জনতা’ নামে কিছু মানুষ। তাদের হামলায় আহত হয়েছে কয়েকজন। হিন্দু বাড়ি, দোকানের টাকা ও সোনা লুটের অভিযোগ করেছেন আক্রান্তরা। গত শুক্রবার দিনে ও রাতে ওই হামলার ঘটনা ঘটে।

এর আগে গত ১৮ জুন নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের এক ছাত্রের একই ধরনের ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে অভিযুক্ত ওই ছাত্র ও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে হেনস্তার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে আরও একটি ঘটনায় নড়াইল জেলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে চলেছে।

পুলিশ ছিল নীরব: শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকে দীঘলিয়ায় হিন্দুদের ওপর আক্রমণ শুরু হয়। আক্রমণ থেমে থেমে বেশ রাত পর্যন্ত চলে। লোহাগড়ার দুজন স্থানীয় সাংবাদিক ওইদিন বিকেলের দিকে হিন্দুদের ওপর হামলার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তারা নাম না প্রকাশ করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে গতকাল টেলিফোনে বলেন, একটা মিছিল পুলিশের সামনে দিয়ে যায়। সে সময় মিছিলকারীরা সামনে হিন্দুদের যেসব বাড়িঘর পেয়েছে সেখানে ভাঙচুর করেছে। এরপর তারা আখড়াবাড়ি সার্বজননী মন্দিরে যায়। সেখানে গিয়ে তারা মন্দিরে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেখানে হিন্দুদের একটা বিগ্রহ বা মূর্তি ছিল তাতেও আগুন ধরিয়ে দেয়। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হলে তার নির্দেশে পুলিশ এসে আগুন নেভায়।

ওই দুই সাংবাদিক বলেন, জুমার নামাজের পর আক্রমণ শুরু হয়। ঠিক ওই সময় লোহাগড়া থানার প্রধান গেট বন্ধ ছিল। ভেতরে দুজন পুলিশ পাহারা দিচ্ছিলেন। সেখানে জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ছিলেন এটা তারা জানতে পেরেছেন। রাত ৯টার দিকে যখন হামলা থেমে যায়, তারও পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে এসপি দীঘলিয়ায় যান, সেখানে গিয়ে তিনি পুলিশকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ওই দুই সাংবাদিকের ভাষ্যমতে, দীঘলিয়া বাজারসংলগ্ন এলাকায় বাস করা পরিবারগুলোর মধ্যে অধিকাংশই হিন্দু পরিবার। তবে দীঘলিয়া বাজারে প্রভাব দেখিয়ে থাকেন মূলত দীঘলিয়া ইউনিয়নের কুমড়ি, তালবাড়িয়া গ্রামের মানুষ। শুক্রবারের হামলায় এই দুই গ্রামের মানুষের পাশাপাশি মাওলি ও সারোল গ্রাম থেকে সেখানে লোক জড়ো হয়েছিল। এই গ্রামগুলো দীঘলিয়া বাজার থেকে বেশ দূরে। তারা পরিকল্পিতভাবেই সেখানে এসেছিল বলেও তাদের মত।

এ বিষয়ে জানতে এসপি প্রবীর কুমার রায়কে গতকাল রাত ৯টা ২০ মিনিট থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত চারবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠালেও সাড়া দেননি তিনি।

হামলা ভাঙচুর লুটপাটের ঘটনায় মামলা: আমাদের নড়াইল প্রতিনিধি জানান, ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে গত শুক্রবার রাতেই দীঘলিয়া গ্রামের কচি সরদার বাদী হয়ে লোহাগড়া থানায় আকাশের নামে মামলা করেছে। গত শনিবার রাতে আকাশকে খুলনা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল তাকে আদালতে পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের হেফাজতে (রিমান্ড) নিয়েছে পুলিশ। শুক্রবার আকাশের বাবা অশোক সাহাকেও পুলিশ থানায় নিয়ে যায়। তিনি এখনো বাড়ি ফেরেননি।

অন্যদিকে দীঘলিয়ার হিন্দুদের দোকানপাট ভাঙচুর ও লুট, বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুট করা এবং মন্দিরে আগুন দেওয়ার বিষয়ে লোহাগড়া থানায় মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন লোহাগড়া থানার ওসি শেখ আবু হেনা মিলন।

শুক্রবার জেলার এসপি প্রবীর কুমার রায় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। 

এদিকে গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জুনায়েদ সাকি।