সড়ক দুর্ঘটনায় মা মারা যাওয়া অবস্থায় ‘অলৌকিকভাবে’ জন্ম নিয়ে দেশবাসীকে আবেগে সিক্ত করেছে এক শিশু। জানা গেছে, ওই শিশুর মা-বাবা আর এক বোন ছাড়াও দুই সদস্য সড়ক দুর্ঘটনাতেই নিহত হয়েছেন।
শনিবার (১৬ জুলাই) দুপুর ২টায় উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের রায়মনি গ্রাম থেকে জাহাঙ্গীর আলম (৪০) তার আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর আল্ট্রাসনোগ্রাম করার জন্য ছয় বছরের মেয়েকে নিয়ে ত্রিশাল পৌর এলাকায় আসেন। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক পারাপারের সময় মালবাহী ময়মনসিংহগামী একটি ট্রাক তাদের চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই পরিবারের তিনজন নিহত হয়। সড়কেই অন্তঃসত্ত্বা রত্না বেগমের পেটে থাকা শিশুর জন্ম হয়। এ ঘটনা সারা দেশের মানুষকে নাড়া দেয়।
সোমবার সরেজমিনে জাহাঙ্গীর আলমের পৈতৃক ভিটায় গিয়ে দেখা যায়, বসতঘরের পাশেই দাফন করা তিনটি কবরের দিকে নির্বাক তাকিয়ে আছেন জাহাঙ্গীরের মা-বাবা ও আরো দুই সন্তান। কয়েক দিন কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিও যেন কোথায় শুকিয়ে গেছে। জাহাঙ্গীরের মা ও বাবা দুজনই প্রতিবন্ধী। তারা জানেন তাদের ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতি আর কখনো ফিরে আসবে না। কিন্তু জাহাঙ্গীর ও রত্নার সন্তান এবাদত (৬) এখনো মনে করে তাদের বাবা-মা-বোন ফিরে আসবে। যখন মানুষের কাছে শোনে তাদের বাবা-মা আর কখনো আসবে না তখন কান্না শুরু করে। আর মোবাইলে থাকা বাবা-মা-বোনের ছবি বের করে সবাইকে দেখায়।
জাহাঙ্গীরের মা সুফিয়া বেগম মলিন চোখে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, এক নতুন সদস্য আসার কথা ছিল আমাদের পরিবারে। তার বদলে তিন তিনটি লাশ এল।
জাহাঙ্গীরের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু জানান, আমার ছেলের রেখে যাওয়া স্মৃতি হাসপাতালে রয়েছে। আমি, আমার স্ত্রী দুজনই প্রতিবন্ধী, চলতে পারি না। আরো দুটি নাতি রয়েছে। আমি চিন্তা করেছি, সবার দায়িত্ব যদি কেউ নেয়, তাহলে নবজাতক নাতিটিকে দত্তক দেব। আর আমার ছেলে মারা যাওয়ার পর অনেকেই আশ্বাস দিয়েছে সাহায্যের, কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসে নাই।
তিনি বলেন, ‘থাকার ঘরের জায়গাটুকু ছাড়া আমার নিজের কোনো জমিজমা নেই। থাকার ঘরও ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। ঘরের চাল ফুঁটা, বৃষ্টি আসলেই পানি পড়ে। দুই ছেলে ছিল তারাও মারা গেছে সড়ক দুর্ঘটনায়। নতুন তিন কবরের পাশে ২০০৪ সালে ট্রাকচাপায় নিহত আমার ছোট ছেলে শামছুল আলমের কবরও রয়েছে। তারও আগে ১৯৯৫ সালে আমার ভাই ফজলুল হকও মারা যান সড়ক দুর্ঘটনায়। বাড়ির পাশে সাত কবরের পাঁচজনই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়’।
নিহত জাহাঙ্গীরের বড় মেয়ে জান্নাত (৮) বলেন, ‘রোববার রাতে আমার ছোট বোনকে হাসপাতাল থেকে দেখে এসেছি। আমার বোন অনেক সুন্দর হয়েছে। আমার ছোট বোনকে কেউ দত্তক নিলে আমাদের দুই ভাই-বোনকেও দেখতে হবে। আর আমার ছোট বোনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। তাকে দেখতে চাইলে আমাদের দেখাতে হবে। আমাদের বাবা, মা নেই প্রধানমন্ত্রী আমাদের না দেখলে আমরা কোথায় যাব? আমার বাবা আমাকে পড়াশোনা করিয়ে অনেক বড় করতে চেয়েছেন’।
নিহত জাহাঙ্গীরের বোন মাহমুদা খাতুন জানান, আমার ভাই জাহাঙ্গীর অনেক পরিশ্রমী ছিল। আমার প্রতিবন্ধী বাবা-মাকে যে দেখত। তাদের দেখার আর কেউ রইল না। নবজাতককে কেউ দত্তক নিলে আমার ভাইয়ের আরো দুটি সন্তান রয়েছে তাদের দায়িত্বও নিতে হবে। আমার বাবা-মা প্রতিবন্ধী তাদেরও দেখার কেউ নেই।
নিহত জাহাঙ্গীরের চাচাতো ভাই শরিফ উদ্দিন শিপন জানান, আমার ভাই মারা গেলেও স্মৃতি হিসেবে নবজাতক শিশুটিকে রেখে গেছে। ভাই নিহতের পর থেকে অনেকে সাহায্যের কথা বললেও এখনো আমরা কোনো সহযোগিতা পাইনি। এ পরিবারকে যদি স্থায়ী সমাধান না করা হয়, তাহলে বেঁচে থাকা কষ্ট কর হয়ে যাবে। নবজাতক শিশুটিকে চাচা/চাচি দত্তক দেবে তবে, আরো দুটি শিশু আছে তাদের দায়িত্বও নিতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আক্তারুজ্জামান জানান, ‘ডিসি মহোদয় আমাকে নিহত পরিবারের খোঁজখবর নিতে পাঠিয়ে ছিলেন। তাদের আজ (সোমবার) উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা নগদ অর্থ প্রদান করা হয়েছে। আর নিহতের মা প্রতিবন্ধী সুফিয়া বেগমকে প্রতিবন্ধী কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। নিহত পরিবারটির খোঁজখবর সব সময় অব্যাহত থাকবে। নিহতের পরিবারকে কেউ সাহায্য করতে চাইলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে’।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, ‘অলৌকিক’ ওই শিশুকে দুর্ঘটনাস্থল থেকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে ময়মনসিংহের কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশুটি বর্তমানে ময়মনসিংহ নগরীর লাবীব প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।