খেলাফত মজলিশের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, ‘আগামী বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কিংবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলকে আসন্ন ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সংসদ গঠনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
আর বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে সিইসি বলেন, ‘নির্বাচনের নামে নাটক মঞ্চস্থ হোক তা আমরা কখনোই চাইব না। নির্বাচন নিয়ে ইসি একটা সংকটে পড়ে গেছে। কারণ একটি বড় দল বলছে, তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না। আরেকটি দল বলছে, নির্বাচন হবে।’
সিইসির এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব এম এ মতিন বলেছেন, কমিশনের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। ইসিকে ক্ষমতা না দেওয়া হলে তারা সুষ্ঠু ভোট উপহার দিতে পারবে না।
গতকাল সোমবার দলগুলোর সঙ্গে পৃথক সংলাপে সিইসি ও দলের প্রতিনিধিরা এসব মন্তব্য করেন। সংলাপে সিইসি ছাড়াও চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
সিইসি বলেন, ‘নির্বাচনটা একটা জটিল কর্মযজ্ঞ। অনেক প্রস্তুতি, সমঝোতার প্রয়োজন হয়। আমাদের তরফ থেকে প্রস্তুতিগুলো নিচ্ছি। আইনে যে সক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, কিছু এখতিয়ার আমাদের আছে। আচরণ বিধিমালা, পরিচালনা বিধিমালা অনুযায়ী কাজ করব।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই সব দলের অংশগ্রহণে যেন নির্বাচন হয়। অংশগ্রহণ বলতে বড় দলগুলোর অংশগ্রহণ বড় পরিসরে যেন হয়। আমি পত্রিকায় পড়েছি যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বা সমমনা দল, তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচনে অংশ নেবে না। তাদের নিজস্ব কিছু প্রোগ্রাম আছে যে নির্বাচনকালীন সরকার কী বিশিষ্ট হবে।’
সিইসি আরও বলেন, ‘এটা কিন্তু অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, সংশয় সৃষ্টি করেছে। বিএনপি যদি অংশ না নেয়, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আয়োজন করার যে উদ্দেশ্য, সেটা হয়তো সফল হবে না। আমরা হয়তো নির্বাচন করব। বিএনপি কিন্তু অন্য দলের সঙ্গে বসে, বিশেষ করে শাসক দলের সঙ্গে বসে সুরাহা করতে পারে, একটা ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে। তাহলে সেই ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন হতে কোনো বাধা নেই। সেই প্রতিশ্রুতি আমরা পাচ্ছি না। সেই অবস্থাটা আসেনি। এখনো একটা সংশয়, দ্বিধাদ্বন্দের মধ্যে আছি যে আল্টিমেটলি বিএনপি কি নির্বাচনে আসছে? না ওই অবস্থাটা সরকারের সঙ্গে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে একটা অবস্থান সৃষ্টি করবে। তারপর নির্বাচনে আসবে। যা-ই হোক সেটা এখনো অনিশ্চিত।’
কাজী হাবিব বলেন, ‘এখন আমরা যেটা করছি, বিএনপিকে আহ্বান করছি, তারা যেন নির্বাচনে আসে। তাদের রাজনৈতিক কৌশল যদি ভিন্ন হয়, সেটা নিয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। তার পক্ষে বা বিপক্ষে আমাদের কোনো অবস্থান নেই। একটা রাজনৈতিক দল তাদের নিজস্ব স্বাধীনতা আছে, তাদের প্রজ্ঞা অনুসারে যেকোনো কৌশল বা প্রোগ্রাম হাতে নিতে পারে। আমাদের কাজ যেহেতু নির্বাচন করা, যারা নির্বাচনে অংশ নেবে তাদের সঙ্গে সংলাপ করতে চাই। সবাইকে বলব, অংশগ্রহণ করে যে সংসদ হবে, সেটা যেন গণতান্ত্রিক হয়, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমেই তারা যেন জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল একটি সংসদ গঠন করেন।’
নির্বাচনের সময় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ইসির অধীনে আনার প্রস্তাব বাস্তবায়ন জটিল বলে মনে করেন সিইসি। তিনি বলেন, ‘এর সঙ্গে জটিল সাংবিধানিক বিষয় জড়িত রয়েছে। এটি নিয়ে সব রাজনৈতিক দল নিজেদের মধ্যে সংলাপ করতে পারে। নির্বাচন কমিশনের অনেক ক্ষমতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতে হয়তো কোনো কারণে সেই ক্ষমতা পুরোপুরি প্রয়োগ করতে পারেনি। কিন্তু আমরা সেটি প্রয়োজনে প্রয়োগ করার চেষ্টা করব।’
সিইসি বলেন, ‘কারও প্রতি আমাদের অনুরাগ-বিরাগ নেই। আমাদের প্রত্যাশা সবাই নির্বাচন করবে। আমাদের শুধু একটাই কাজ, ভোটারকে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। কোন বাক্সে ভোট যাবে, কে কাকে ভোট দেবে, সেটি আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। কেউ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দিলে, আমরা তা প্রতিহত করব।’
সংলাপে বসে নিজের দায়িত্ব পালন বিষয়ে অবস্থান ব্যাখ্যা করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী আউয়াল বলেন, ‘দায়িত্ব থেকে বিতাড়িত করতে হবে না। দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে পথ সুগম করে দেব। যেকোনো উপায়ে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অপরিহার্য।’
ইসির ক্ষমতা সীমাবদ্ধ মন্তব্য করে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব এম এ মতিন বলেন, ক্ষমতা না দেওয়া হলে ইসি সুষ্ঠু ভোট উপহার দিতে পারবে না। সিইসিকে উদ্দেশ করে এই নেতা আরও বলেন, কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্যকে কোনো একটা কারণে এলাকা ছাড়তে বলেছিল ইসি। অত্যন্ত লজ্জাজনকভাবে ওই সংসদ সদস্য সিইসির চিঠি আমলে নেননি। এটা জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। এটি প্রমাণ করল আপনার (সিইসি) ক্ষমতা সীমাবদ্ধ।’
এ সময় নির্বাচনকালে স্থানীয় সরকার, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও অর্থ মন্ত্রণালয় এ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনের অধীনে সাংবিধানিক পন্থায় আনার দাবি জানায় বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট।
গতকাল চারটি দলের সঙ্গে ইসির সংলাপ হয়েছে। দলগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট), খেলাফত মজলিশ ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। আজ মঙ্গলবার যে চারটির সঙ্গে ইসির সংলাপ হবে, সেগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ ও বাংলাদেশের সমাজবাদী দল (এমএল)।
** বিএনপিকে উদ্দেশ করে কমিশনার আহসান হাবিব ‘আসেন, দেখেন চা খেয়ে যান, সিদ্ধান্ত আপনাদের’ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের সঙ্গে সংলাপে নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জে. (অব.) আহসান হাবিব খান বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘অন্যরা সংলাপে আসছে। আপনারাও আসেন। দেখেন। চা খেয়ে যান। সিদ্ধান্ত আপনাদের। তবে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়ার জন্য আপনাদের সহযোগিতা আমাদের দরকার।’
তিনি বলেন, নির্বাচনটিকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য আইনের ক্ষেত্রে যেসব জায়গায় আমরা কিছুটা পিছিয়ে আছি, সে জন্য আরপিও সংশোধনের ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ জন্য আপনাদের সহযোগিতা দরকার। আমাদের কাজ হচ্ছে রেফারির ভূমিকা নেওয়া। আমাদের ৩৯টি টিম আছে। খেলবে তো তারা। তারা যদি সুন্দর, স্বচ্ছভাবে খেলে তাহলে সেমিফাইলে-ফাইনালে এসে যে জয়ী হবে, সেটা গ্রহণযোগ্য হবে, কারও প্রতি ইসির পক্ষপাতিত্ব বা সহযোগিতার প্রশ্নই আসে না। আপনারা চোখ-কান খোলা রাখেন। কর্মীদের নির্দেশ করবেন, আমাদের কোনো পক্ষপাতিত্ব আছে কি না, তা দেখার জন্য।’