রনিল বিক্রমাসিংহেই শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট

জনগণের মধ্যে জনপ্রিয়তা না থাকলেও সংসদ সদস্যদের ভোটে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রত্যাশামতোই জয় পেয়েছেন রনিল বিক্রমাসিংহে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা দেশটির পার্লামেন্ট নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে গতকাল বুধবার ভোটের আয়োজন করে। ২২৫ আসনের পার্লামেন্টে তিনি ১৩৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। জয়ের পরই রনিল বলেছেন, ‘এর মধ্য দিয়ে সংকটজর্জর শ্রীলঙ্কার বিভক্তির অবসান হয়েছে। আমাদের মধ্যে এখন আর কোনো বিভক্তি নেই।’ তবে বিরোধীরা বলছেন, রাজাপাকসেদের অনুসারী রনিলকে তারা প্রেসিডেন্ট হিসেবে মানবেন না। তারা তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।

এ অবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েক মাস ধরে চলতে থাকা গণবিক্ষোভ আর অর্থনৈতিক ধস থেকে শ্রীলঙ্কাকে বের করে আনাটা সহজ হবে না নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য। পশ্চিমাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলেও পরের দুই বছর ক্ষমতায় টিকে থাকায় রনিল বিক্রমাসিংহের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তবে নতুন প্রেসিডেন্ট বিভক্তি অবসানের কথা বললেও বাস্তবতা ভিন্ন। আল-জাজিরাকে বিক্ষোভকারীদের নেতা মেলানি গুনাথিলাকে বলেছেন, ‘আমরা বর্তমানে আমাদের কৌশল ও পুনরায় সংগঠিত হওয়া নিয়ে আলোচনা করছি। রনিল বিক্রমাসিংহে পদত্যাগ না করা পর্যন্ত গোতাগোগামায় (বিক্ষোভস্থল) নিশ্চিতভাবে আমাদের সংগ্রাম এবং অবস্থান কর্মসূচি আমরা চালিয়ে যাব।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ভালো করেই জানি, গোতাবায়া আর রনিল একই লোক নন। তিনি (রনিল বিক্রমাসিংহে) আরও ধূর্ত লোক। সম্প্রতি তিনি জরুরি অবস্থা জারি করে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। তিনি গোতাগোগামায় বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার পাঠিয়েছেন। কিন্তু আমি মনে করি না, এসবে মানুষ আর ভয় পাবে।’

গুনাথিলাকে বলেন, ‘শ্রীলঙ্কা এমন নেতা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে, যিনি নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের চেয়ে দেশের জনগণের বিষয়ে যতœবান হবেন।’

নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসেদের সরকার উৎখাতে রাজপথে নামেন বিক্ষোভকারীরা। আন্দোলনের একপর্যায়ে গদি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকা দুই ভাই গোতাবায়া ও মাহিন্দা রাজাপাকসে। ফলে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যেতে হয় লঙ্কান পার্লামেন্টের এমপিদের। এতদিন থেকে প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে রাজাপাকসেদের সঙ্গে আঁতাত করার অভিযোগ উঠেছিল। কারণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজাপাকসেদের দল শ্রীলঙ্কান পদুজানা পেরামুনা তাকে সমর্থন দেয়। ফলে নতুন প্রেসিডেন্ট পেলেও দেশটির পরিস্থিতি শান্ত হবে বলে মনে হচ্ছে না।

এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে শুরুতে প্রার্থী ছিলেন চারজন। তবে দুলাসের সমর্থনে শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়ান সঙ্গী জন বালাওয়েগারের (এসজেবি) সাজিথ প্রেমাদাসা। গতকাল ২২৫ আসনের পার্লামেন্টে একজন এমপি ভোটদানে বিরত ও একজন অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকায় জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১১২ ভোট। সে জায়গায় ১৩৪টি পেয়েছেন রনিল বিক্রমাসিংহে। অন্য দুই প্রার্থীর মধ্যে দুলাস আলহাপেরুমা পেয়েছেন ৮২ ভোট আর অনূঢ়া কুমারা দিসানায়েকে পেয়েছেন মাত্র ৩ ভোট।

বর্তমান পার্লামেন্টে ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির (ইউএনপি) একমাত্র প্রতিনিধি রনিল বিক্রমাসিংহে। অথচ চলমান সংকটে ঘুরেফিরে প্রধানমন্ত্রী, ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হলেন তিনি। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য অনেক নেতার মতোই রাজনৈতিক পরিবার থেকে এসেছেন রনিল। তার চাচা জুনিস জয়াবর্ধনে এক দশকের বেশি সময় শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৭৭ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিক্রমাসিংহে। সে সময় প্রেসিডেন্ট ছিলেন জুনিস জয়াবর্ধনে। ওই সরকারেই সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী হন তিনি। তামিল গেরিলাদের হাতে সাবেক প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসা নিহত হওয়ার পর ১৯৯৩ সালে প্রথমবার শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হন রনিল বিক্রমাসিংহে। সেবার মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। ছয়বার প্রধানমন্ত্রী হলেও কোনোবারই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। শেষবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দুই মাসের মাথায় ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

অভিজ্ঞ এ রাজনীতিককে পশ্চিমাপন্থি বাজার সংস্কারবাদী হিসেবে মনে করা হয়। অর্থনৈতিক সংকটে ডুবতে বসা শ্রীলঙ্কাকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সহায়তা (বেল-আউট তহবিল) এনে দিতে তাকে সম্ভাব্য আলোচক হিসেবেও মনে করা হচ্ছে। সাবেক আইনজীবী রনিল বিক্রমাসিংহে একসময় সাংবাদিকও হতে চেয়েছিলেন। এএফপিকে তিনি বলেছিলেন, ১৯৭৩ সালে সংবাদপত্রের পারিবারিক ব্যবসাকে জাতীয়করণ করা না হলে সম্ভবত তিনি সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিতেন।

রনিল বিক্রমাসিংহে গত দুটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়াই করে হেরে গেছেন। দলকে টানা পরাজয় উপহার দেওয়ায় খোদ সমর্থকরাও তাকে ‘রেকর্ড লুজার’ বলে আখ্যা দেন। তার বিরুদ্ধে রাজাপাকসেদের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ পুরনো। তাদের সমর্থনেই মূলত তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পেরেছেন। এ কারণে শ্রীলঙ্কা নতুন প্রেসিডেন্ট পেলেও দেশটির পরিস্থিতি সহসা শান্ত হবে বলে মনে হচ্ছে না।