চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে বাবার ঋণ পরিশোধের জন্য ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়া শিশু রিয়া ও ইভাকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার সকালে উদ্ধারের পর দুপুরে তাদের প্রকৃত মা-বাবার কাছে হস্তান্তর করা হয়। ‘দুই কন্যাসন্তান বিক্রি করে বিদ্যুৎ বিল ও ঋণ পরিশোধ’ শিরোনামে গতকাল দৈনিক দেশ রূপান্তরে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওই শিশুদের উদ্ধারে বাবা এমরান হোসেনকে নিয়ে মাঠে নামে পুলিশ।
হাজীগঞ্জ থানার পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বিক্রি হওয়া দুই শিশুর মধ্যে চাঁদপুর সদরের পাঁচ নম্বর রামপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ আলগী গ্রামের বরকান্দজ বাড়ির প্রবাসী মোতালেব বরকান্দজের ঘর থেকে সিরাতুন মুনতাহা ইভাকে (৫) এবং ফরিদগঞ্জ উপজেলার মান্দারতলী গ্রামের ভূঁইয়া বাড়ির বাবুল ভূঁইয়ার ঘর থেকে রিয়াকে (৩) উদ্ধার করা হয়। পরে শিশুদের মা, বাবা এবং বিক্রির পর লালন-পালনকারী দুই পক্ষকে থানায় নিয়ে আসা হয়। এরপর উভয় পক্ষকে বসে শিশুদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বলা হয়। নতুবা শিশু বিক্রি ও কেনার অপরাধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়। এরপর ইভা ও রিয়াকে তাদের প্রকৃত মা-বাবার কাছে হস্তান্তরে রাজি হন বিক্রির পর লালন-পালনকারী দুই পরিবারের সদস্যরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, থানায় আনার পর ইভা ও রিয়া তাদের প্রকৃত মা-বাবাকে চিনতে পারেনি। এমনকি বড় বোন ইভা বুঝতেও পারেনি যে রিয়া তার আপন বোন। দুজনে এক জায়গায় থাকায় একজন আরেকজনকে বন্ধু বলে সম্বোধন করে। তারা কেউই তাদের পালিত মাকে ছেড়ে যেতে চায়নি। তাদের সকালে থানায় নিয়ে এলেও বেলা ৩টার দিকে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় দুই শিশু ও তাদের পালিত মায়ের কান্নায় থানা চত্বরে উপস্থিত আরও অনেকের চোখেও জল চলে আসে। কিছুক্ষণের জন্য সেখানে থাকা সবাই স্তব্ধ হয়ে পড়েন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইভা ও রিয়াকে কেনা দুই দম্পতিই ছিল নিঃসন্তান। মোতালেব বরকান্দজ ও বাবুল ভূঁইয়া প্রবাসে থাকায় তাদের স্ত্রীরা থানায় আসেন। তবে তারা কেউই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। অবশ্য তাদের সঙ্গে আসা কয়েকজন জানান, দুই দম্পতিই নিঃসন্তান হওয়ায় ইভা ও রিয়াকে আদর-যতেœ লালন-পালন করেন। দুই শিশুকে তাদের বাবার কাছ থেকে স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে দত্তক নেওয়ার দাবি করে ওই দুই পরিবার।
এদিকে দীর্ঘদিন পর নিজের শিশুসন্তানদের ফিরে পেয়ে খুশিতে কাঁদতে থাকেন ইভা ও রিয়ার মা জান্নাত বেগম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার মেয়েদের আমার কাছে ফিরে পেয়ে কী যে আনন্দ লাগছে তা বোঝাতে পারব না। আমি ওদের আর কখনো কারও কাছে দেব না।’
হাজীগঞ্জ থানার ওসি জোবাইর সৈয়দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদি কেউ সন্তান দত্তক নিতে চান, তাহলে অবশ্যই তাকে আদালতের মাধ্যমে নিয়ম অনুযায়ী নিতে হবে। এছাড়া দত্তক নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়টি জানা ছিল না বলে দাবি করেছেন ইভা ও রিয়াকে বিক্রির পর লালন-পালনকারী দুই পরিবারের সদস্যরা। দুই শিশুকে তাদের বাবার কাছ থেকে স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে দত্তক নেওয়ার দাবি করে ওই দুই পরিবার। সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে শিশুদের আমরা তাদের প্রকৃত মা-বাবার কাছে হস্তান্তর করেছি।’
উল্লেখ্য, বছরখানেক আগে মা জান্নাত বেগমকে না জানিয়ে বিদ্যুৎ বিলের বকেয়া ৪০ হাজার টাকা ও ঋণ পরিশোধে দুই শিশুকন্যাকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন বাবা এমরান হোসেন। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে ছোট মেয়ে দেড় বছরের রিয়াকে ৪০ হাজার টাকা ও ঋণ পরিশোধে বড় মেয়ে তিন বছরের ইভাকে ৪০ হাজার টাকা করে মোট ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়।
এমরান হোসেন হাজীগঞ্জের বড়কুল পশ্চিম ইউনিয়নের নাটেহরা গ্রামের মিজি বাড়ির বাসিন্দা। তিনি পেশায় বেকারি পণ্যের ব্যবসায়ী। এমরান হোসেন দুই বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাত বেগমকে চট্টগ্রামের একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতে পাঠান তিনি। আর তার দুই শিশুসন্তানকে প্রথম স্ত্রী ইয়াছমিনের কাছে রেখে দেন। এর মধ্যে দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাত বেগমকে না জানিয়ে ৪-৫ মাস আগে-পরে দুই শিশুসন্তানকে বিক্রি করে দেন।