এবারের ঈদযাত্রায় সড়কে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় মোটরসাইকেল চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয় ১২৩ জন, যা ঈদযাত্রায় মোট নিহতের ৩৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ। বিগত চার ঈদুল আজহার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার রেকর্ড ভেঙেছে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ঈদুল আজহার আগে-পরে ১২ দিনে (৫ জুলাই-১৬ জুলাই) দেশে ২৭৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১১ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে কমপক্ষে ১ হাজার ১৯৭ জন। নিহতের মধ্যে নারী ৪৩ ও শিশু ৫৮। ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয় ১২৩ জন, যা ঈদযাত্রায় মোট নিহতের ৩৯.৫৪ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ৪৬ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ১৪.৭৯ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছে ৫৩ জন, অর্থাৎ ১৭.০৪ শতাংশ।
যানবাহনভিত্তিক নিহতের চিত্র : দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী ১২৩ জন (৩৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ), বাসযাত্রী ৩৩ জন (১০ দশমিক ৬১), ট্রাক-পিকআপ-লরি আরোহী ১৬ জন (৫ দশমিক ১৪ শতাংশ), বাস-প্রাইভেট কার যাত্রী ১৮ জন (৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ), থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজিচালিত অটোরিকশা-অটোরিকশা-অটোভ্যান) ৫৭ জন (১৮ দশমিক ৩২ শতাংশ), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নছিমন-আলমসাধু-টমটম-মাহিন্দ্রা-পাওয়ার টিলার) ১০ জন (৩ দশমিক ২১) এবং বাইসাইকেল-প্যাডেল রিকশা আরোহী ৮ জন (২ দশমিক ৫৭ শতাংশ) নিহত হয়েছে।
দুর্ঘটনা হওয়া সড়কের ধরন : রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১০৯টি জাতীয় মহাসড়কে, ৭৭টি আঞ্চলিক সড়কে, ৬১টি গ্রামীণ সড়কে এবং ২৭টি শহরের সড়কে হয়েছে।
দুর্ঘটনার ধরন : দুর্ঘটনাগুলোর ৭৬টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৯৯টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ৫১টি পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া, ৪২টি যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ৬টি অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা : মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত চালক ও আরোহীদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৩৪ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছর এবং নিহত পথচারীদের ৩২ দশমিক ৬০ শতাংশ বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় নিহত হয়েছে।
২০২১ সালের ঈদুল আজহা উদযাপনকালে ৮৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৯৫ জন নিহত হয়েছিল। তার তুলনায় এ বছর ঈদুল আজহায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে ৮৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং প্রাণহানি বেড়েছে ১৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ : সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে ভোরে ৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ, সকালে ২২ দশমিক ৬২ শতাংশ, দুপুরে ১৯ দশমিক ৭০ শতাংশ, বিকেলে ২০ দশমিক ৮০ শতাংশ, সন্ধ্যায় ৯ দশমিক ৮৫ দশমিক এবং রাতে ২২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারি পরিসংখ্যান : দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারি পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ আর প্রাণহানি ৩৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ। রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ঘটে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং প্রাণহানি ১৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ঘটেছে ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ ও প্রাণহানি ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। ১৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে খুলনা বিভাগে। আর এ বিভাগে প্রাণহানি ১১ দশমিক ৫৭ ভাগ। বরিশালে দুর্ঘটনা ৫ দশমিক ৪৭ ভাগ, প্রাণহানি ৫ দশমিক ৪৬ ভাগ। সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৪ দশমিক ৭৪ ভাগ এবং প্রাণহানি ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। রংপুরে দুর্ঘটনা ৬ দশমিক ৯৩ ভাগ, প্রাণহানি ৯ দশমিক ৩২। ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৫ দশমিক ১০ এবং প্রাণহানি ৫ দশমিক ৭৮ ভাগ।
ঈদযাত্রা ও দুর্ঘটনা পর্যালোচনা : এবারের ঈদুল আজহা উদযাপনকালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ২৬ জন নিহত হয়েছে। দুর্ঘটনা ফিরতি যাত্রায় বেশি হয়েছে। গত বছর ঈদুল আজহার চেয়ে এ বছরের ঈদুল আজহায় দুর্ঘটনা বেড়েছে ৫৯ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং প্রাণহানি বেড়েছে ৩৭ দশমিক ৬১ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনা রোধে টেকসই সড়ক পরিবহন কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।