রাতে নারী অ্যাডিশনাল এসপি সকালে সাবেক দেহরক্ষীর লাশ

মাগুরার শ্রীপুরে পুলিশের এক অতিরিক্ত উপকমিশনারের (এডিসি) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার নাম খন্দকার লাবণী আক্তার (৪৫)। গত বুধবার রাত ১২টার দিকে সারঙ্গদিয়া গ্রামের নানাবাড়ি থেকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। পরে পরিবারের লোকজন হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক লাবণীকে মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে এডিসি লাবণী আক্তারের লাশ উদ্ধারের পর গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মাগুরা পুলিশ লাইনস থেকে তার সাবেক দেহরক্ষী কনস্টেবল মাহমুদুল হাসানের (২৩) গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার হয়। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে পুলিশ লাইনসের ব্যারাকের ছাদ থেকে তার মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।

খন্দকার লাবণী খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে এডিসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দুই দিন আগে ছুটিতে মাগুরায় আসা এই পুলিশ কর্মকর্তা বিসিএস ৩০তম ব্যাচের ছিলেন। আর কনস্টেবল মাহমুদুল হাসান দেড় মাস আগে মাগুরায় বদলি হয়ে আসেন। মাগুরার পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা, খন্দকার লাবণী গলায় ফাঁস দিয়ে আর নিজ নামে ইস্যু করা অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন মাহমুদুল হাসান।

পুলিশ ও পরিবারের সদস্যরা জানান, বুধবার মধ্যরাতে শ্রীপুরের সারঙ্গদিয়া গ্রামে নানা বাড়িতে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন এডিসি খন্দকার লাবণী আক্তার। তার বাবার বাড়ি শ্রীপুরের বরালিদহ গ্রামে। তবে জন্ম থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবন কেটেছে সারঙ্গদিয়ায় নানা মৃত কুদ্দুস মাস্টারের বাড়িতে। শ্বশুরবাড়ি মাগুরার হাজিপুর গ্রামে। স্বামী তারিক আব্দুল্লাহ ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে ভারতে চিকিৎসাধীন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের খুলনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক। অন্যদিকে কনস্টেবল মাহমুদুল হাসানের বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের পিপুলবাড়িয়া গ্রামে। দেড় মাস আগে খুলনা থেকে বদলি হয়ে মাগুরায় আসেন তিনি। কনস্টেবল মাহমুদুল একসময় খুলনায় চাকরি করাকালে লাবণী আক্তারের দেহরক্ষী ছিলেন। পুলিশ কর্মকর্তা লাবণী আক্তারের দুটি সন্তান রয়েছে, কনস্টেবল মাহমুদুল অবিবাহিত ছিলেন।

মাগুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারঙ্গদিয়া গ্রামে নানাবাড়িতে বুধবার রাত ১২টার দিকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খন্দকার লাবণী আক্তার। পরিবারের সদস্যরা ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অপরদিকে কনস্টেবল মাহমুদুল হাসান বুধবার রাতের ডিউটি শেষে ভোরে ব্যারাকে ফিরে ছাদে গিয়ে নিজ নামে ইস্যুকৃত শটগান মাথায় ঠেকিয়ে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। গুলির শব্দ শুনে অন্যরা ছুটে গিয়ে তাকে মাগুরা ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালে নিলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’

তবে দু’জন কী কারণে আত্মহত্যা করেছেন তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি উল্লেখ করে পুলিশ কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ‘মাহমুদুল দেড় মাস আগে খুলনা থেকে বদলি হয়ে মাগুরায় আসে। সে একসময় পুলিশ কর্মকর্তা খন্দকার লাবণীর দেহরক্ষী ছিল বলে জানা গেছে। এ দুটি আত্মহত্যার রহস্য উদঘাটনে জোর পুলিশি তদন্ত শুরু হয়েছে।’

বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার শফিকুল আজম জানান, তার মেয়ে খন্দকার লাবণীর সঙ্গে স্বামী তারিক আব্দুল্লাহর দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য কলহ চলে আসছিল। এ কারণে এর আগেও ঘুমের বড়ি খেয়ে এবং গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন লাবণী। গত রবিবার ছুটিতে নানা বাড়িতে আসেন লাবণী। লাবণীর ৮ ও ৩ বছর বয়সী দুই মেয়ে রয়েছে।

লাবণী আক্তারের মামা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘রাতে আমরা সবাই একসঙ্গে খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাই। রাত ১২টার দিকে লাবণীর মোবাইল ফোনে একটি কল আসে। সে অপর প্রান্তের ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার পরপরই ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে। মোবাইলে কী কথা হয় তা উদ্ধার করা গেলে আত্মহত্যার কারণ জানা যেতে পারে।’

কনস্টেবল মাহমুদুল হাসানের বাবা মো. এজাজুল হক খান চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশে কনস্টেবল পদে কর্মরত। তিনি জানান, দুই বছর চার মাস আগে তার ছেলে পুলিশে যোগ দেন। বুধবার রাত ১০টার দিকে মোবাইল ফোনে সর্বশেষ ছেলের সঙ্গে কথা হয়। যশোর রোডে ডিউটিতে আছে বলে মাহমুদুল তখন জানায়। এ সময় স্বাভাবিকভাবেই কথা বলে। তার কথায় কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না। পরে সকাল ৯টার দিকে ছেলের মৃত্যু সংবাদ পান এজাজুল হক খান। কিন্তু কী কারণে ছেলে আত্মহত্যা করেছে তা বুঝতে পারছেন না।

পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুর সংবাদ শুনে খুলনার বিভাগীয় অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অপারেশন) মো. নজরুল ইসলাম, খুলনা রেঞ্জ পুলিশ সুপার মো. তোফায়েল আহম্মেদ, মাগুরার পুলিশ সুপার জহিরুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

মাগুরা পুলিশ সুপার জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘একই দিনে দু’জনের আত্মহত্যার নেপথ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ঘটনার জোর তদন্ত চলছে।’