সরকারের ওপর বিদেশি চাপ বাড়াতে তৎপর বিএনপি

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আটঘাট বেঁধে মাঠে নেমেছে রাজপথে সরকারবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। দলটি সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের চাপ বাড়াতে বিদেশেও তৎপর।

দলটির কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিন আগে বেলজিয়ামের ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল। এছাড়া কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশে বিএনপির কূটনৈতিক কার্যক্রম চলছে। বিদেশে বিএনপির এ তৎপরতা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে বসে সমন্বয় করছেন বলে ওই নেতারা জানান। চলতি মাসে দেশেও ইইউ রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধির সঙ্গে বিএনপির বৈঠক হয়েছে।

দলটির দায়িত্বশীল জ্যেষ্ঠ নেতারা গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনীতিসহ সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ফেলেছে। দেশকে রক্ষায় সরকার হটানো ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। তাই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করার আগে একাধিক কাজে হাত দিয়েছেন তারা। এর মধ্যে রয়েছে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পুনর্গঠন, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ, ঢাকায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের সঙ্গে বৈঠক।

গত ডিসেম্বরে র‌্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর বিএনপি আন্তর্জাতিকভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য আরও তৎপর হয়ে ওঠে। এরপর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় বিএনপি।

বিএনপি নেতারা বলছেন, তারা নিজেদের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলন করতে চাই। পাশাপাশি সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের পরিকল্পনা তৈরি করছেন। এর বাইরে দেশে-বিদেশে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াচ্ছেন। বিএনপি চায় না কেউ তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দিক। তবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আদায়ে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো যেভাবে এগিয়ে এসেছে সেটা অব্যাহত থাকবে বলে তারা আশা করছেন।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই। আইনের শাসন ও মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে, গুম-খুন হত্যা হচ্ছে। এসব কিন্তু কোনো অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক বিষয়। সারা বিশ্ব এসব অবগত। বিশ্বের যেকোনো শক্তি এবং বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরের আন্তর্জাতিক সংগঠন যারা গণতন্ত্রের পক্ষে, মানবাধিকারের পক্ষে, সুশাসনের পক্ষে, তারা বাংলাদেশে যা চলছে তার সবই অবগত।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে সবার যোগাযোগ আছে। কারণ এটি করা বিএনপির নৈতিক দায়িত্ব। যারা অবগত, এ নিয়ে কাজ করে তাদের সঙ্গে অব্যাহতভাবে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে এবং থাকবে।’

গত ১২ জুলাই গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক জিন লুইসের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। ওই বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে জিন লুইসের সঙ্গে রেবেকা বেকি নামে আরেকজন জাতিসংঘের কর্মকর্তা অংশ নেন।

গত ১৩ জুলাই ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াটলির সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি নেতারা। বৈঠকের পর আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে আমাদের যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের মধ্যে যে প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো আছে সব বিষয়ের ওপর আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি।’ কিন্তু প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো কী সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য ও বেলজিয়াম বিএনপির নেতা সাইদুর রহমান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১৯ জুলাই বেলজিয়ামে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পার্লামেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে ইইউ পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় দেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, খালেদা জিয়ার স্থায়ী মুক্তি ও একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি জানানো হয়। ইইউ পার্লামেন্টের সদস্যরা এসব দাবি নিয়ে কাজ করবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন।’

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্যরা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘র‌্যাব এবং র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তাকে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকে সরকার চাপে আছে। নানামুখী কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করাতে পারছে না। পাশাপাশি সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের চাপ রয়েছে। ইইউও ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে তারা বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায়।’

কানাডা বিএনপির সভাপতি মো. ফয়সাল আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা কাজ করছি। এর অংশ হিসেবে গত ১০ মে কানাডার পররাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক ভাইস চেয়ারম্যান স্টিফেন বারজেরন এমপি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে স্টিফেন বারজেরন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো এবং বাংলাদেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাকে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানান।’

ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘চিঠি পাঠানোর পর গত ৬ জুলাই কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার খলিলুর রহমানকে তার দপ্তরে ডেকে পাঠান স্টিফেন বারজেরন। এ সময় তিনি যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন তার ফলোআপ জানতে চান।’