লোডশেডিং পরিস্থিতি সমন্বয়ে আরও ১০ দিন সময় চেয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। গতকাল শুক্রবার ঢাকার গুলশানে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন তিনি। বিদ্যুৎ বিতরণে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতির উন্নয়নে ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগবে। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে লোডশেডিং কীভাবে আরও কমিয়ে সূচি মেনে চলা যায়, সে জন্য নেওয়া হবে নতুন পরিকল্পনা।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ^জুড়ে তৈরি হওয়া মন্দাভাব ঠেকাতে সরকারের সাশ্রয়ী নীতির অংশ হিসেবে সূচি করে লোডশেডিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও তা ঠিকভাবে সমন্বয় করতে পারছে না বিদ্যুৎ বিভাগ।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এক সপ্তাহ সময় নিয়ে আমরা দেখছি, আমাদের কতটুকু লোডশেডিং করা দরকার। কীভাবে এটাকে আমরা আরেকটু কমিয়ে নিয়ে আসব। ১০টা দিন হলে পরে আস্তে আস্তে ঠিক করে নিয়ে আসব, বেটারের দিকে যাবে। ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে পুরো বিষয় পর্যবেক্ষণ করে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
তিনি জানান, দেশে যে ডিজেল আমদানি করা হয়, তার মাত্র ১০ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়। সেই ১০ ভাগ ডিজেল বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার না করায় প্রতিদিন এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
নসরুল হামিদ বলেন, ‘পিক আওয়ারে ইন্ডাস্ট্রির গ্যাসের ডিমান্ড বেড়ে যায়। ওরা সন্ধ্যাবেলা চালায়। একটা সপ্তাহ আমরা দেখছি। অ্যাভারেজে কত হচ্ছে, কোনো কোনো সময় ২ হাজার হচ্ছে, কোনো কোনো সময় ২ হাজার ২০০ হচ্ছে, আবার কোনো কোনো সময় দেড় হাজার হচ্ছে। এই সপ্তাহের রেজাল্ট পেলে পরে নেক্সট সপ্তাহে আরেকটা প্ল্যান করব। আমাদের টাইমিং শিডিউলটা ঠিক করব। টাইমিং ঠিক রাখতে পারছি কি না। শহরে আমরা পারছি; গ্রামে পারছি না। কোনো কোনো গ্রামে তিন, চার, পাঁচ ঘণ্টাও হয়ে যাচ্ছে। ওখানে আমরা কী মেজার নেব, এক সপ্তাহ পরে আমরা চিন্তাভাবনা করব।’
লোডশেডিং নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নসরুল হামিদ বলেন, ‘কোনো ভিআইপি বা অ-ভিআইপি এলাকা নির্দিষ্ট করা নেই। একটা ফিডার বন্ধ করলে ওখানে ভিআইপি পারসন যাদের বলি, তারাও আছেন, সাধারণও আছেন। এমন কিছু নেই।’
কূটনৈতিকপাড়া থেকে বিষয়টি বিবেচনার একটি অনুরোধ তার কাছে এসেছে বলেও জানান তিনি।
নসরুল হামিদ বলেন, ‘ডিপ্লোম্যাটিক জোন থেকে অনুরোধ করা হয়েছে যেন একটু লক্ষ রাখা হয়। তারা কিন্তু বলেননি, লোডশেডিং বন্ধ করে দিতে হবে। তারা লক্ষ রাখতে বলেছেন, বিষয়টি আমরা লক্ষ রাখছি।’
বিদ্যুতের চাহিদা, উৎপাদন, ঘাটতি নিয়ে বিস্তারিত জানাতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘গ্যাস থেকে আমরা ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেতে পারি। সেখানে কয়লা আছে। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনছি। ত্রিপুরা থেকে বিদ্যুৎ আনছি। নবায়নযোগ্য জ¦ালানি আছে। আমাদের এই যে তেল আছে, তেল থেকে প্রায় আমরা ছয় হাজার মেগাওয়াট দিতে পারি। ছয় থেকে সাত হাজার ম্যাক্সিমাম। আর বাকি বিদ্যুৎ তিন হাজারের মতো আমরা ধরে রাখতে পারি। সব মিলিয়ে হলো ১৮ হাজার। এর সঙ্গে যদি আমি ক্যাপটিভ পাওয়ার যোগ করি, তাহলে আমার সব মিলিয়ে হবে ২৫ হাজারের মতো। মোট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১০ শতাংশ সার্ভিসিংয়ের মধ্যে থাকে, এটা ধরে নিয়ে হিসাব করা হয়। আমরা যদি ধরে নিই ১০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র সার্ভিসিংয়ের মধ্যে থাকে, ফলে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার মেগাওয়াটের মতো এখান থেকে চলে যায়। আর ১০ শতাংশ আমাকে হাতে রাখতে হয়। একটা কেন্দ্রে যদি ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকে, তাহলে আমরা নিতে পারি ৮০ মেগাওয়াট। এটা ব্যালেন্স করার জন্য। আর ১০ পার্সেন্ট যদি বাদ দিই, আরও ২ হাজার চলে গেল। ১৫ হাজারের মতো আমার হাতে ক্যাপাসিটি আছে। ১৫ হাজার চালাতে গেলে আমার যে পরিমাণ গ্যাস লাগবে, যে পরিমাণ তেল লাগবে, সেই ক্যাপাসিটিতে তেল যদি আমি পাই, তাহলে আমি খুব নির্বিঘেœ দিতে পারি। আমাদের এখন ডিমান্ড আছে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০-এর মতো। ১৪ হাজার ৫০০ যখন বলছি, এটা সন্ধ্যাবেলায়। পিক আওয়ারের সময়। আর দিনের বেলায় ১১ থেকে সাড়ে ১২ হাজার। আগামী বছর হয়তো এটা আরও ১ হাজার বাড়বে।’
ডিজেল পাওয়ার প্ল্যান্টের পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজেলে পাওয়ার প্ল্যান্ট আছে আমাদের ১ হাজার মেগাওয়াট মাত্র। ২৫ হাজারের মধ্যে ১ হাজার মাত্র তেলভিত্তিক ডিজেল দিয়ে চলে। সেটা আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ ডিজেলের দাম অনেক বেড়ে গেছে। ডিজেল যে পরিমাণ ইমপোর্ট করে বাংলাদেশ, তার মাত্র ১০ শতাংশ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তাই আমাদের জায়গা থেকে বলছি যে ১০ পার্সেন্ট যদি কাটঅফ করি, দেখি কী হয়। বাকি ৯০ ভাগ ডিজেল পরিবহন ও সেচকাজে ব্যবহার হয়।’
আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কয়েকটা মাস যদি আমরা চিন্তা করে ব্যবহার করি, ফরেন কারেন্সির রিজার্ভের কথা চিন্তা করে যদি করি, আমাদের সমস্যা হওয়ার কথা না।’