আমদানি ব্যয়ের চাপ, ডলারের বিপরীতে টাকার অব্যাহত অবমূল্যায়ন, রিজার্ভ ধরে রাখতে সরকারের ব্যয়সংকোচন নীতিমালাসহ বিভিন্ন কারণে অর্থনীতিতে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে তার প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারেও। কোরবানির ঈদের পর টানা ৯ কার্যদিবস পুঁজিবাজারে দরপতন হচ্ছে। বিপুল লোকসানে পড়ে পুঁজির নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এমন পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করে বড় লোকসান এড়াতে চাইছেন। কিন্তু ক্রেতাসংকটে শেয়ার বিক্রি করতে পারছেন না তারা।
ক্রেতাসংকটে গতকাল রবিবারও দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন হওয়া ৮৩ শতাংশ শেয়ার দর হারিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৪০ শেয়ারে একপর্যায়ে কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি। বেশিরভাগ শেয়ারের দরপতনে গতকালও ডিএসইতে বড় দরপতন দেখা দিয়েছে। দরহ্রাসে সার্কিট ব্রেকারের ২ শতাংশ সীমার মধ্যেই গতকাল ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৭৪ পয়েন্ট হারিয়েছে। এ নিয়ে টানা ৯ কার্যদিবসে সূচকটি ৩১৪ পয়েন্ট হারিয়ে ৬০৫২ পয়েন্টে নেমেছে। টানা দরপতনের ফলে সূচকটি ফিরে গেছে ১৩ মাস আগের অবস্থানে। সূচকটির অবস্থান এর চেয়ে নিচে ছিল গত বছর ২৯ জুন, ৬০৪২ পয়েন্টে।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা হতাশ। তারা মনে করছেন, আগামীতে সংকট আরও বাড়বে। তাই লোকসান কমাতে শেয়ার বিক্রি করছেন বিনিয়োগকারীরা। ডলার সংকটের কারণে বিদেশিরাও শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও নিষ্ক্রিয়। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানায় উৎপাদন কমে যাবে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা, যা বিক্রি চাপ বাড়াতে সহায়তা করছে। বৈশি^ক কারণে শুধু স্থানীয় কোম্পানি নয়, বহুজাতিক কোম্পনিগুলোর আয় কমেছে। ফলে সব মিলিয়ে এখন আস্থা রাখার মতো পরিবেশ নেই পুঁজিবাজারে।’
আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে রেকর্ড ঘাটতির কারণে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে দেশে। বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতিতে নাকাল দেশ। বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানি আয় বাড়লেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে তা এখন কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। রেমিট্যান্সও কমে গেছে। আমদানি ব্যয় সামাল দিতে এবং রিজার্ভ নিরাপদ রাখতে ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে সরকার। জ্বালানি ব্যয় কমাতে দেশে নিয়মমাফিক লোডশেডিং দিচ্ছে। এতে করে উৎপাদনমুখী কোম্পানির উৎপাদন কমে যেতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে ডলার নিয়ে। ডলারের সরবরাহে ঘাটতি থাকার কারণে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে এর দর। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতি ডলার ৯৪ টাকা ৪৫ পয়সা নির্ধারণ করলেও আমদানিকারকদের তা অন্তত ১০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এর কারণেও উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
এদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার অব্যাহত অবমূল্যায়নের ফলে বিদেশিরাও শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। আর অর্থনৈতিক সংকটের কারণে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করছেন। শেয়ার বিক্রির এ চাপ বাজার নিতে না পারায় প্রতিদিনই দরপতন হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) হাতেও নেই। এর আগে বিভিন্ন সময়ে মন্দা তৈরি হলে মার্জিন ঋণসহ বিভিন্ন সুবিধার মাধ্যমে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার সাময়িক চেষ্টা চালালেও এখন তেমন কোনো টুলস তাদের হাতে নেই। তবে এসইসি জানিয়েছে, তারা বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৮৬টি শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটের মধ্যে দর হারিয়েছে ৩১৯টির, বেড়েছে ৪৩টির ও অপরিবর্তিত রয়েছে ২৪টির দর। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া সব খাতই বাজার মূলধন হারিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজার মূলধন কমেছে সেবা ও নির্মাণ, কাগজ ও প্রকাশনা, ভ্রমণ, বিবিধ,জ্বালানি, সিমেন্ট, সিরামিকস, পাট, বীমা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত। এসব খাতের শেয়ার বাজার মূলধন গতকাল ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। টানা ৯ কার্যদিবসের পতনে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে এসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৈশ্বিক কারণে দেশের অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়ছে। এখানে আমরা অনেকটা অসহায়। তবে এ পরিস্থিতি নিশ্চয়ই দীর্ঘায়িত হবে না। এখন প্রথম করণীয় হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত না হওয়া, আমরা সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছি, যাতে লোকসানে কম দামে শেয়ার না বিক্রি করেন। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এখন বাজারে এসব বিনিয়োগকারীই শেয়ার কিনছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ব্রোকার ডিলারদের বিনিয়োগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান বাজার থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিয়েছে কি না, সেসব অনুসন্ধান চলছে। পাশাপাশি অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বিশেষ করে মার্চেন্ট ব্যাংক, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, বিএপিএলসির সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা আশা করছি, শিগগিরই বাজার আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে।’