শিল্পে ব্যবহার্য গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তৈরি পোশাক, ইস্পাত, সার ও সিরামিক কারখানাগুলোতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। লোডশেডিং ও গ্যাসের কম চাপ বেশিরভাগ কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করছে। শক্তির বিকল্প উৎস ব্যবহার করে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছেন মালিকরা। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন রপ্তানিকারকরা। ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো মনে করছে, এ সংকট মোকাবিলায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে একটি পরিকল্পনা দেবে এফবিসিসিআই।
গ্যাসস্বল্পতার কারণে গ্যাসনির্ভর বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় ঈদুল আজহার আগেই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে রাশ টানা হয়েছিল। বিশ্বে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত গ্যাস বা এলএনজির দাম বাড়ায় বাংলাদেশে আমদানি কমেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে দাম চড়ে যাওয়ায় খোলাবাজার বা স্পট মার্কেট থেকে বাংলাদেশ এলএনজি কেনা বন্ধ রাখে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের দাম বৃদ্ধি। বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় জোগান কমে যাওয়ায় বাজারে ডলারের সংকট দেখা যাচ্ছে। আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় এ মুদ্রার দাম বেড়েই চলেছে।
এ পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে, অর্থাৎ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করা হচ্ছে, সপ্তাহে এক দিন পাম্প বন্ধ রাখা হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ৭ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, সারা দেশে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করা, সরকারি অফিসের সময় সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত করা, বিয়ের অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শেষ করা, শীতাতপনিয়ন্ত্রণযন্ত্রের (এসি) তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখা, আলোকসজ্জা না করা, রাত ৮টার মধ্যে শপিং মল বন্ধ, ঘরে বসে কাজ করা যায় কি না এসব ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এসবের সঙ্গে মসজিদ-মন্দিরে বিদ্যুতের ও এসির ব্যবহার কমিয়ে আনতে পারলে বিদ্যুতের চাহিদা ৫০০ মেগাওয়াট কমে আসবে।
ওই দিন বিকেলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘বিশ্বে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ায় বিভিন্ন দেশ সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য অনেক রকমের পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরাও মনে করি, আমাদের কিছুটা সাশ্রয়ী হওয়া দরকার।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট আমিন হিলালী গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুতের ব্যবহার কীভাবে হওয়া উচিত, সে বিষয়ে অংশীজনদের মতামত নিয়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সরকারকে সুপারিশ করা হবে। সরকার তা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবে বলে আশা করছি। সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ বিদ্যুৎ কীভাবে উৎপাদন করা যায় সে বিষয়ে একটি সেমিনার করবে এফবিসিসিআই। এসব নিয়ে আমরা জরিপ শুরু করেছি। অস্থিরতা তৈরি হলে গৃহিণীরাও জিনিসপত্র কেনা শুরু করেন। ৫ কেজি দরকার হলেও ৭ কেজি কেনেন। তখন বাড়তি চাপ পড়ে বাজারের ওপর।’
তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও খাদ্যশস্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় রাশিয়া-ইউক্রেন চুক্তির ফলে খাদ্যশস্যের দাম কমতে শুরু করেছে। দাম চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করলেও মাঝে মাঝে দুষ্টু ব্যবসায়ীরা এ পরিস্থিতির সুযোগ নেয়। সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। সেটা করতে গিয়ে যেন উৎপাদন ব্যাহত না হয়। উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি কমে যাবে, স্থানীয় বাজারেও দাম বাড়বে। তখন বাজারে আবার একটা অস্থিরতা তৈরি হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের অপচয় বন্ধ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমানো এবং ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনতে হবে। বাকিটা বেসরকারি খাত থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ডলার ও জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট শহীদুল্লাহ আজিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে এবং উৎপাদন অনেক কমে গেছে। মেশিন বন্ধ রাখা হচ্ছে। কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। সরকারের কাছে পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ নেই। আমরা চাইলেও এসবের জোগান দিতে পারব না। সরকারের একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল। সকাল-বিকেলের পরিকল্পনা না। সারা জীবন আমাদের গ্যাস থাকবে না, বিদ্যুৎ থাকবে না, তাহলে বিকল্প কী? সব দেশই কিন্তু পরিকল্পনা করে রাখে। গ্যাসের মজুদ আরও বাড়াতে হবে।’
রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার মালিকরা জানিয়েছেন, লোডশেডিংয়ের কারণে দিনে তিন-চার ঘণ্টা জেনারেটর চালু রাখতে হয়। ফলে ৩-৫ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে উৎপাদন খরচ প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে। তাদের উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আরডিএম গ্রুপের চেয়ারম্যান রকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘লোডশেডিং পোশাক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত করছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) চিঠি দিয়েছি। সীমিত পরিসরে ডিজেল-জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও গ্যাস সংকটের মধ্যেও উৎপাদন অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি স্পিনিং মিলের মালিক বলেন, ‘কারখানা চালানোর জন্য ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পর থেকে চাপ ১ দশমিক ৮ পিএসআই থেকে ৩ দশমিক ২ পিএসআইর মধ্যে রয়েছে। ফলে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’