বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকারের শাসনামলে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর একটি উক্তি বেশ আলোচিত হয়েছিল ‘কুকুরে লেজ নাড়ায় না লেজ কুকুরকে নাড়ায়’। স্বীয় দলের নেতৃত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে উক্তিটি করেছিলেন তিনি।
এই উক্তি স্মরণ করার প্রেক্ষাপট দেশ এখনো বিদ্যমান। দেশের বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সাম্প্রতিক কয়েকটি সিদ্ধান্ত দেশবাসীকে হতাশার মধ্যে ফেলেছে। এক. হেফাজতে ইসলাম নামক ওয়াহাবি মতবাদের একটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা ছেড়ে তারা আমাদের শিক্ষাক্রমের মূলধারায় হস্তক্ষেপ করে তাদের দাবি পূরণ করে নিয়েছে। দুই. হেফাজতের আমির ‘তেঁতুল হুজুর’ খ্যাত প্রয়াত শাহ আহমদ শফী নারী নেতৃত্বকে ঘৃণাভরে অস্বীকার করে নানা বক্তব্য-বিবৃতি, প্রচার-প্রচারণার পরও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার কোনোরূপ সংস্কার ব্যতিরেকে তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়কে মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছিলেন। তিন. ওই একই শক্তি দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক কিছু ভাস্কর্য অপসারণের দাবি তুলেছে। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের প্রবেশ মুখে ‘থেমেসিস’ ভাস্কর্যটি সরানোর দাবির প্রতি সরকারও সহমত প্রকাশ করেছিল। চার. পহেলা বৈশাখকে হিন্দুয়ানি উৎসব দাবি তুলে তা বর্জনের জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ঐদিন বিকেল ৫টায় দেশের সমস্ত উৎসবস্থল পুলিশি নির্দেশে বন্ধ করে দিয়েছিল। সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতি সরকারের এই নতজানু নীতিতে দেশবাসী হতবাক-বিমূঢ়।
দেশের মানুষের প্রচলিত ধারণাটি হচ্ছে আওয়ামী লীগ দলটি ধর্মনিরপেক্ষ না হলেও অসাম্প্রদায়িক। সেটা অসংগতও নয়। কেননা এই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই তিন নীতির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রের মূলনীতি নির্ধারিত করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। বাহাত্তরে সংবিধান প্রণয়নের সময় জাতীয়তাবাদ অন্তর্ভুক্ত করে শাসনতন্ত্রের চার প্রধান নীতি গ্রহণ করা হয়। ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকার ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করে। ২৩ ডিসেম্বর সচিবালয়ের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই তিন নীতির ওপর ভিত্তি করেই দেশকে গড়ে তোলা হবে।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘এই মুক্তিযুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তারা সংগ্রাম করেছিলেন আইনের শাসন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার পাশাপাশি শোষণ ও বৈষম্য চিরতরে অবসানের জন্য এবং একমাত্র সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এদেশের সকল মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করা সম্ভব।’ ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকালে দিল্লির সংবর্ধনা সভায় এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে দেওয়া ভাষণে অভিন্ন বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। তিনিও সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন।
কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশ সেই অবস্থানে থাকতে পারেনি। সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর প্রথম আঘাতটি আসে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ‘ওআইসি’ সম্মেলনে যোগদানের মধ্য দিয়ে। ওআইসি একটি ধর্মভিত্তিক জোট। যার সব সদস্য মুসলিম রাষ্ট্র। যারা ধর্মনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করে না। পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান সংবিধান থেকে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিদায় করে এবং নিষিদ্ধ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি উন্মুক্ত করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন। অপর সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আরও এক-কদম এগিয়ে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রবর্তন করেন। এভাবে বাংলাদেশ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা সাংবিধানিকভাবে নির্মূল হয়ে গেছে।
এদেশের সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ আজ সেই জোট কেবলই সরকার সমর্থক একটি সাংস্কৃতিক জোট হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করে এই জোটকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এখন সরকারদলীয় অঙ্গ সংগঠনের মতো দায়িত্ব পালন করে চলেছে। নিজেদের মান ও মুখ রক্ষায় তারা নানা শঠতার পন্থা অবলম্বন করবে, সেটাই স্বাভাবিক। নিজেদের অসাম্প্রদায়িক ইমেজ রক্ষায়ই তারা মাঠে নেমে সরকারের জন্য সুবিধাজনক পথ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে, এবং করবেও।
অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটছে বা ঘটানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে তার পেছনে স্থানীয় প্রশাসন ও ক্ষমতাধরদের ইন্ধন যে নেই, সেটাও নিশ্চয় বলা যাবে না। সাম্প্রদায়িক অশুভ গোষ্ঠীসমূহকে আশকারা দেওয়ার মাশুল দিয়ে চলছে সংখ্যালঘু হিন্দু-বৌদ্ধ সম্প্রদায়। সাম্প্রতিক সময়ে নড়াইলে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাটি তারই জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে। আর এসবের মূলে রয়েছে অসাম্প্রদায়িক তকমার দাবিদার শাসক দলের ভোটের রাজনীতি। রাজনীতির সঙ্গে ধর্মযোগ যে কত ভয়ংকর হতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উপমহাদেশের ইতিহাসের পাতায় পাতায় রয়েছে। দেশে যে অরাজক সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে ও বিরাজ করছে তার দায় সরকার এড়াতে পারে না।
হেফাজতে ইসলাম তাদের ইচ্ছানুযায়ী কওমি মাদ্রাসা চালাবে। সরকারের হস্তক্ষেপ তারা মানবে না। মাদ্রাসা ছেড়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে তারা মাধ্যমিকে হাত ঢুকিয়েছে। ব্যাপক রদবদলে মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তক সাম্প্রদায়িকীকরণ করেছে। আর জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মারক ভাস্কর্য ধ্বংসের প্রবণতাও এবারই কিন্তু প্রথম নয়। অতীতে শিশু একাডেমির চত্বরে ‘দুরন্ত’ ভাস্কর্যটি রাতের অন্ধকারে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টেও ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছিল। বিগত সেনাশাসিত সরকারের শাসনামলে বিমানবন্দরের সড়ক দ্বীপে ‘লালন ভাস্কর্য’ ভেঙে সেটা অপসারণেও এদের মুখ্য ভূমিকা ছিল।
যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাকে নৈতিকভাবে গ্রহণ ও স্বীকার করতে পারেনি। তাদের কাছে নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার অভিলাষে সরকারের এই আপস-আত্মসমর্পণ দেশ-জাতিকে চরম লজ্জা-অপমানে ফেলেছে। প্রশ্ন আসে সরকার হেফাজতকে নাড়ছে না হেফাজত সরকারকে নাড়ছে। এক্ষেত্রে হেফাজতের সাফল্যের পাল্লাটাই কিন্তু ভারী। এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবিদার সরকারের সাফল্য কোথায়?
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত