উচ্চশিক্ষা কীভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখবে

এক দশক ধরে আমি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেভাবে তাদের প্রোগ্রামগুলো পরিচালনা করছে ও জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে এবং আমরা যেভাবে করি বা অবদান রাখি তা অনুসরণ ও গবেষণা করছি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে একটি ফেলোশিপের অধীনে আমি হার্ভার্ড, এমআইটি, স্ট্যানফোর্ড এবং মন্টানাসহ বেশ কয়েকটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছি এবং মতবিনিময় করেছি। এই অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণ আমাকে এই ধারণা দিয়েছে যে, অচিরেই আমাদের উচ্চশিক্ষার গতানুগতিক মডেল পরিবর্তন প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুসারে, দেশে ৫২টি সরকারি, ১০৮টি বেসরকারি এবং ২টি আন্তর্জাতিকসহ মোট ১৬২টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যিক বিশ্বে শিক্ষা এখন শুধু সেবা নয়, ব্যবসাও। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য একই দর্শন বহন করে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন। কর্ম এবং শিক্ষার জগৎ ক্রমবর্ধমানভাবে বিশ্বজুড়ে মিলে যাচ্ছে। শিক্ষাকে শুধু জ্ঞান সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে চিন্তা না করে বরং আমাদের কর্মমুখী শিক্ষার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে।

২০১৯-২১ সালের মধ্যে কোনো একটি নির্দিষ্ট বছরে অস্ট্রেলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের অর্থনীতিতে ৪১ বিলিয়ন ডলার অবদান রেখেছে এবং মোট ২৬০ হাজার পূর্ণকালীন চাকরি জোগান দিয়েছে। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের দেশে ৩৬.৯ বিলিয়ন, ৫৫ বিলিয়ন এবং ৯৫ বিলিয়ন ডলার অবদান রেখেছে এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ৪৫০, ৭০০ এবং ৮১৫ হাজার চাকরির জোগান দিয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে এবং স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের প্রভাব বা অবদান সম্পর্কে চিন্তা করার এখনই সঠিক সময়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের কৌশলে পরিবর্তন এনেছে এবং বিভিন্ন শিক্ষাকার্যক্রম নিয়ে মানুষের দোরগোড়ায় চলে যাচ্ছে। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেমন হার্ভার্ডএক্স, হার্ভার্ড এক্সটেনশন স্কুল, এমআইটিএক্স, এমআইটি অনলাইন, ইউএমও অনলাইন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এমনকি কমিউনিটি কলেজপর্যায়ে তারা ব্লেন্ডেড পদ্ধতিতে অনেক বৃত্তিমূলক প্রোগ্রাম অফার করছে, যেমন ৩০ ঘণ্টা অনলাইন সেশন এবং ৩ দিন অন-ক্যাম্পাস প্রশিক্ষণ। এগুলো তাদের স্থানীয় চাকরির বাজারে ও বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত চাহিদাপূর্ণ প্রোগ্রাম। বাংলাদেশ বিভিন্ন খাতে ডিজিটালি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে কিন্তু ব্লেন্ডেড ও অনলাইন শিক্ষায় সাফল্য এখনো আশানুরূপ নয়। তাই আমরা এখনো ২০২৬ সালের মধ্যে ৩৭৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বৈশ্বিক অনলাইন শিক্ষাশিল্পে আমাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারিনি, যা সহজেই রাজস্ব আয়ের একটি ভালো উৎস হতে পারত।

২০২১ সালে বাংলাদেশ সরকার শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির নেতৃত্বে প্রি-স্কুল থেকে স্নœাতকোত্তর পর্যন্ত একটি ব্লেন্ডেড শিক্ষা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ১০-১১টি মন্ত্রণালয়কে অন্তর্ভুক্ত করে একটি জাতীয় ব্লেন্ডেড শিক্ষা টাস্কফোর্স গঠন করে। এই টাস্কফোর্স সবার জন্য ব্লেন্ডেড শিক্ষা নামে একটি কৌশল গ্রহণ করেছে, যেখানে রয়েছে তাৎক্ষণিক (২০২৩ সালের মধ্যে), স্বল্পমেয়াদি (২০২৫ সালের মধ্যে), মধ্যমেয়াদি (২০৩১ সালের মধ্যে) এবং দীর্ঘমেয়াদি (২০৪১ সালের মধ্যে) পরিকল্পনা। এর আগে ইউজিসি গত বছর জাতীয় ব্লেন্ডেড লার্নিং পলিসি অনুমোদন করে। গত তেরো বছরে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের ফলে সারা দেশে প্রায় প্রতিটি সেক্টরের বিশাল আইসিটি অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। সবার জন্য অর্থপূর্ণ, ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং বিশ্বব্যাপী আমাদের শিক্ষার ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করতে এখন আমরা পূর্ণাঙ্গ ব্লেন্ডেড-অনলাইন শিক্ষা চালু করতে প্রস্তুত। এখন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো দেখা যাক, যা আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি। সবার জন্য উপলব্ধ সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা। ব্লেন্ডেড অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবকাঠামোর মধ্যে ছাত্রসংখ্যা ২-৩ গুণ বাড়ানো যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মোনাশ অস্ট্রেলিয়া এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র এবং শিক্ষকের অনুপাত যথাক্রমে ৪১:৭ এবং ১৬:৯। অনুরূপ অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও মোনাশের ছাত্রসংখ্যা কমপক্ষে ৩-৪ গুণ বেশি।

দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রমে কারিগরি উপাদানগুলোকে একীভূত করা : প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকের তাদের শিক্ষার পটভূমি (বিজ্ঞান, ব্যবসা, কলা) নির্বিশেষে পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে একটি বৃত্তিমূলক শিক্ষা উপাদান থাকা উচিত যেমন অটোমোবাইল, বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং, গ্রাফিকস, ভিডিও সম্পাদনা, অ্যানিমেশন ইত্যাদি। যাতে তারা ভবিষ্যতের কাজের জগতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে। এরা চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে অন্যদের জন্য চাকরির জোগান দিতে পারবে।

টিএ ও এলএ : টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট (টিএ) ও লার্নিং অ্যাডভাইজার (এলএ) পদে বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজারো চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। শিক্ষকের কাজ হলো ৫০-১০০ জন শিক্ষার্থীর ক্লাস সামনাসামনি পরিচালনা করা আর ২০ জন টিএ বা এলএ ৫০০ শিক্ষার্থীর অনলাইন ক্লাসে সাপোর্ট দেবে। এ ছাড়া ব্লেন্ডেড-অনলাইন শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাজারো লার্নিং ডিজাইনার এবং টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন হবে।

উচ্চশিক্ষা ঋণ কর্মসূচি : এটি করদাতার আয় এবং দেশ ও বিদেশের বাজারে প্রোগ্রামের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। করদাতার আয়ের ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, সরকার-ভর্তুকি এবং পূর্ণ-ফি প্রদানের মতো উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন স্কিম থাকতে পারে। স্নাতক হওয়ার পর তারা যখন চাকরি পাবে বা উদ্যোক্তা হবে, তখন তাকে ধীরে ধীরে শিক্ষাঋণ পরিশোধ করতে হবে।

স্বতঃস্ফূর্তভাবে আয়কর জমা দেওয়া : উচ্চশিক্ষার জন্য সরকারি ঋণ বা ভর্তুকি গ্রহণের মাধ্যমে উন্নত ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষার্থীদের পিতা-মাতা বা আইনি অভিভাবকদের আয়কর জমা দিতে হবে, অন্যথায় তারা এ ধরনের সুযোগের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি : আমাদের স্নাতকপর্যায়ের শিক্ষার মান তুলনামূলক ভালো, শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতও ভালো, তার পরও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং খারাপ। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম। আমাদের দুটি শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাত্র ০-৩ শতাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী রয়েছে, যেখানে অস্ট্রেলিয়ার বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ এবং এখান থেকে তারা প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার আয় করে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় বৃদ্ধিকরণ : যখন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং গবেষণা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আয় করতে পারবে, তখন তারা বিদেশ থেকে ভিজিটিং প্রফেসর এবং এক্সপার্টদের আনতে পারবে, বিশেষ করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যারা শিক্ষা ও গবেষণা উভয় ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিকভাবে অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষ করেছে। এটি আমাদের স্নাতকোত্তর শিক্ষা, গবেষণা ও প্রকাশনা, এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও উন্নত করবে।

শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ : সব বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন কোর্স এবং প্রোগ্রাম অফার করা উচিত হবে না। টাইমস হায়ার এডুকেশনের মতো একই প্যাটার্ন অনুসরণ করে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি জাতীয় র‌্যাংকিংব্যবস্থা থাকা উচিত। ফলে শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় উভয়ের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক কিন্তু অনুকূল অ্যাকাডেমিক পরিবেশ তৈরি হবে। অ্যাকাডেমিক পদোন্নতি এবং ইনক্রিমেন্টের মানদণ্ডকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে তা অনুসরণ করতে হবে।

কম খরচ, উন্নতমানের শিক্ষা : এটিই আমাদের কৌশল হতে পারে। ২০৪১ সালে বাংলাদেশ একটি উন্নত দেশ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি না হলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। আমরা কি আশা করতে পারি না যে আগামী ১০ বছরের মধ্যে আমাদের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্তত ২০টি আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে সম্মানজনক স্থান করে নেবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ন্যূনতম ১ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখবে এবং প্রতি বছর ১০০০টি গবেষণা বাণিজ্যিকীকরণ ও পেটেন্ট করতে পারবে?

আমাদের নীতিনির্ধারকদের অবিলম্বে ব্লেন্ডেড, অনলাইন ও ট্রান্সন্যাশনাল শিক্ষা বাস্তবায়ন নিয়ে ভাবতে হবে এবং সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করতে পারে তার জন্য যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

লেখক ব্লেন্ডেড ও অনলাইন শিক্ষাবিশেষজ্ঞ এবং ফুলব্রাইট সুশি ফেলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র