করোনা মহামারীর অভিঘাত কাটানোর আগে রাশিয়া-ইউক্রেন চলমান যুদ্ধ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সংকটে পড়া বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক অস্থিরতা চলছে। সরকার সংকট মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ নিয়েছে এবং নিচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম বিদ্যুতের লোডশেডিং। কিন্তু আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, লোডশেডিং অব্যাহত থাকুক তা চান না তারা। কারণ সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। লোডশেডিংয়ের কারণে নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে মাশুল গুনতে হতে পারে। লোডশেডিং এড়াতে তারা সরকারকে মৌখিকভাবে কিছু পরামর্শও দিয়েছেন। এছাড়া দলীয় ফোরামে এসব বিষয়ে কথা বলবেন।
সরকার গত সপ্তাহ থেকে সারা দেশে সময়সূচি ঠিক করে দেওয়ার পর বিদ্যুতের লোডশেডিং চলছে। রাজধানীসহ শহরাঞ্চলে লোডশেডিংয়ে সূচি মানা হলেও গ্রামে-গঞ্জে মানা হচ্ছে না। কিন্তু রাজধানী ছাড়া দেশের অন্য কোথাও সূচি মানা হচ্ছে না বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং অসহনীয় এমন তথ্যও এসেছে গণমাধ্যমে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতারা আরও বলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কবল থেকে মানুষকে বের করে আনতে হবে সরকারকে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারই দেশের মানুষকে ভুলিয়ে দিয়েছে লোডশেডিং। এখন এই লোডশেডিংই আওয়ামী লীগের জন্য গলার কাঁটা হয়ে উঠতে পারে। আগামী নির্বাচনকে মাথায় নিয়ে লোডশেডিং থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সেজন্য তারা চান সরকার জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাড়াক।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের মানুষকে লোডশেডিংয়ে রাখা যাবে না। ব্যক্তিগতভাবে বিদ্যুতের বিকল্প ডিজেল কিনে শিল্পকারখানা সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেকেই ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটাতে বাসাবাড়িতে ডিজেল কিনে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সচল রাখছেন। তাতেও এক ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তা অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও আঘাত হানবে। এগুলো বিবেচনায় নিতে হবে সরকারকে। ওই নেতা আরও বলেন, তিনি মনে করেন জ¦ালানি খাতে এমনিতেই বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয় সরকারকে। সেখানে আরও কিছু ভর্তুকি বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।
ক্ষমতাসীন দলের সভাপতিম-লীর এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি না নিয়ে ভর্তুকি বাড়িয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে হবে। ভর্তুকি দেওয়ার মতো টাকা কোথা থেকে আসবে এমন প্রশ্নে আওয়ামী লীগের ওই নেতা আরও বলেন, বিলাসবহুল সব পণ্য আমদানি দুই বছরের জন্য বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে। বিলাসী পণ্য আমদানিতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। যেমন গাড়ির মতো বিলাসবহুল পণ্য আমদানি ১/২ বছরের জন্য বন্ধ রাখা যায়। প্রয়োজনে এসি, ফ্রিজের মতো অন্য ইলেকট্রনিক্স পণ্য আমদানিও বন্ধ রাখা যেতে পারে। তিনি বলেন, দেশেই এখন এসি-ফ্রিজের মতো বিলাসবহুল পণ্য তৈরি করার সক্ষমতা রয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানের। এর ফলে দেশীয় কোম্পানিগুলোর ওপর মানুষের নির্ভরতা তৈরি করা যাবে। ডলারের সাশ্রয় হবে। তবে তার আগে দেশীয় কোম্পানির সঙ্গে বৈঠক করে অতিরিক্ত মুনাফা আদায় করা যাবে না এমন বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর আরও দুজন সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, এরইমধ্যে লোডশেডিংয়ে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। কারণ গত কয়েক বছর বিদ্যুৎ পরিস্থিতি যে জায়গায় চলে গেছে তাতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা সাধারণ মানুষ এখন লোডশেডিং মানিয়ে নিতে পারছেন না। ফলে তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে সবশেষে মানুষের কথাই ভাবতে হয়। কারণ গণমানুষকে নিয়েই রাজনীতি। আবার সামনে জাতীয় নির্বাচন। সেদিকটাও ভাবতে হবে। তাই ভর্তুকি বাড়িয়ে লোডশেডিং কমানো জরুরি মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক সময়ে বিদ্যুৎ থাকত না দেশে। কখনো কখনো বিদ্যুৎ আসতে দেখেছে দেশের মানুষ। ওই রকম সংকট কমিয়ে ঘরে ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন বৈশি^ক পরিস্থিতি আমাদের সরকারকে লোডশেডিংয়ের দিকে নিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। এটা জনগণকে বুঝতে হবে।’ তবে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতে সরকার বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেয়। এই ভর্তুকি আরও বাড়িয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখা যেতে পারে। ফারুক খান বলেন, ‘আমরা রাজনীতি করি, মানুষের জন্য। মানুষের প্রতিক্রিয়া আমরা পাই।’
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যয় সংকোচনের সব নীতি সময়োপযোগী। একমাত্র বিদ্যুৎ সংকট এড়াতে যে লোডশেডিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে সেক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া জরুরি। তারা বলেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার মধ্য দিয়ে এই সরকার সারা দেশের মানুষকে অভ্যস্ত করে তুলেছে। আর বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে তারা হয়ে গেছে অনভ্যস্ত। ফলে ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া থেকে শুরু করে পারিবারিক জীবনে লোডশেডিং মানিয়ে চলতে তারা আর পারছেন না। তাই অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। এই অসন্তোষ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলতে পারে।