প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, বাংলাদেশে আর ২০১৮ সালের মতো নির্বাচন হবে না। তিনি বলেন, ‘ওটা কীভাবে হয়। ওইভাবে নির্বাচন হবে, এটি আপনারা আশা করেন না। আমরা সেটি জানিও না, দেখিওনি। নির্বাচন নির্বাচনের আইন অনুযায়ী হবে। সময় দেওয়া হবে। ভোটাররা যাবেন। ভোট দিতে থাকবেন। একটা সময় নির্বাচন বন্ধ হয়ে যাবে।’
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি। এছাড়া ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) সঙ্গে সংলাপে সিইসি রাজনৈতিক দলগুলোকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, ‘আশা রাখবেন, পাশে আছি ইনশাআল্লাহ।’
রাজনৈতিক দলগুলোকে ইসির ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে সিইসি বলেন, ‘আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, তার কিছু মূল্য থাকা উচিত। একেবারে যে আমরা ডিগবাজি খেয়ে যাব, তা তো নয়। আমাদের ওপর একটু আস্থা রাখুন। তবে আস্থা রাখতে গিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখলে হবে না।’
নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, ‘লাঠি দিয়ে, হকিস্টিক দিয়ে ইভিএম মেশিনটা ভেঙে ফেলতে পারবেন, কিন্তু এখানে ভোটের নড়চড় হবে না।’
ইসিকে নজরদারিতে রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের নজরদারি থাকতে হবে। আমরা কি আসলেই সাধু পুরুষ, না ভেতরে ভেতরে অসাধু, সেই জিনিসটা যদি আপনারা নজরদারিতে না রাখেন, তাহলে আপনারাও দায়িত্ব পালন করলেন না। কঠোর নজরদারিতে আমাদের (ইসি) রাখতে হবে।’ কোনো অভিযোগ পেলে তা ইসিকে জানানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা আমাদের অবশ্যই চাপে রাখবেন। আমি বিশ্বাস করি, এটা প্রয়োজন আছে। আমাদের কোনো অনিয়ম লক্ষ করলে তা আপনারা প্রকাশ করে দেবেন। আমি বিশ্বাস করি, এটার প্রয়োজন আছে। আমরা কোনোভাবেই পক্ষপাতিত্ব করতে চাই না।’
কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমি যদি হারি সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু আমাদের মনস্তাত্ত্বিক এমন একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কোনোভাবেই হারব না। কিন্তু হারতে তো হবেই একজনকে। এ পরিবর্তনটাও এখন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। জিতলে খুশি লাগবে, হারলে হয়তো মনে কষ্ট লাগবে। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক যে সংকট হারা যাবে না এটা অর্থশক্তির কারণে হতে পারে, অন্য কোনো কারণে হারা যাবে না অথবা রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে হতে পারে। কিন্তু সেই অবস্থা থেকে উঠে আসতে হবে। গণতন্ত্রকে বুঝতে হবে, এর বিকাশকে বুঝতে হবে, এর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে বুঝতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের ভূমিকা যদি ইতিবাচক না হয়, সে দায় আপনাদেরও। ছোট দল হন, বড় দল হন এ জিনিসগুলো আপনাদেরও নজরদারিতে রাখতে হবে; নির্বাচন কমিশন এ জায়গায় দায়িত্ব পালন করেনি সেই ভীতি যদি না থাকে, আমরা তো ভয়ও পাব না।’
সিইসি বলেন, ‘নির্বাচনের সময় অনেকটা ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ওপরই এসে যায়। সংবিধানে সে কথা বলা হয়েছে। আমাদের যে আইন-বিধিমালাগুলো রয়েছে, সে সহায়তা সরকারকে দিতে বলব, সরকার তা দিতে বাধ্য থাকবে। আশা করব, সরকার সে সহায়তা দেবে। সরকারও সেটা বুঝবে। আমরাও আদায় করে নেওয়ার চেষ্টা করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের দায়িত্ব আইনের আলোকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। হতাশ হলে চলবে না। ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে। নির্বাচন কমিশন একা দায়িত্ব পালন করতে পারবে, যদি আপনারা পাশে থাকেন।’
সিইসি বলেন, ‘আমরা বারবার বলেছি, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই। কেউ বলবেন, যে আসার আসুক, না এলে নাই। না, আমি বলব নির্বাচনে যদি সব দল থাকে তাহলে একটা ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। আমরা সাহায্য করতে চাই, সাহায্য-সহায়তা পেতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া যাতে না হয়, সেটা আমরা চেষ্টা করব। রাজনৈতিক হয়রানি যেন না হয়, সেটার কথা বলেছেন। গণহারে যদি কিছু হয়, সেটা পেপার-পত্রিকায় আসবে। আমরা সেটা লক্ষ রাখব।’
কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমরা সংবিধানের নির্দেশনার আলোকে নির্বাচন করার চেষ্টা করব। সরকার সহায়তা দেবে, এটা আমরা বিশ্বাস করি। ইভিএমে হেল্প করার নামে কেউ ভোট দিয়ে দিলে সেটা আমাদের নলেজে আছে। একবার অনিয়ম হয়েছে বলে বারবার হবে এমন নয়। আশা রাখবেন, পাশে আছি ইনশাআল্লাহ।’
এছাড়া গতকাল সংলাপে অংশ নিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনেই ইভিএমে ভোটগ্রহণ চেয়েছে বিকল্প ধারা বাংলাদেশ। তবে এর আগে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে এ মেশিন সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে সংলাপে অংশ নিয়ে এ প্রস্তাবনা দেয় দলটি।
বিকল্প ধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের প্রতিনিধিদল সংলাপে অংশ নেয়। এতে অন্যদের মধ্যে সিইসি, চার নির্বাচন কমিশনারসহ ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে মেজর (অব.) আবদুল মান্নান বলেন, ‘গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। আপনারা নতুন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এজন্য আপনাদের অভিনন্দন। ইতিমধ্যে আপনারা কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতার প্রমাণ রেখেছেন, তাই বিকল্প ধারা বাংলাদেশ সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে ১১ দফা সুপারিশ তুলে ধরে।’
ইসিতে নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলকে সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ৩১ জুলাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ কার্যক্রম।