জনশুমারির যে ফল আমরা পেলাম, এটা একটা প্রাথমিক প্রতিবেদন। এরপর আন্ডারকাউন্টিং বা ওভারকাউন্টিং হয়েছে কি না সেটা পরিমাপ করতে হবে। এজন্য শুমারি-পরবর্তী একটা যাচাই জরিপ করতে হবে। জনশুমারি চলাকালে সিলেটে ও উত্তরাঞ্চলে বন্যা ছিল, কুমিল্লায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছেÑ এসব ব্যাপারগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। এ কাজটি একটি নিরপেক্ষ বডির দ্বারা করতে হবে। এটা করার পর হয়তো দেখা যাবে, জনসংখ্যার আকার বেড়ে গেছে। ২০১১ সালেও আমরা দেখেছি, প্রাথমিক জনশুমারির যে ফল ছিল সেটা পরবর্তী সময়ে বেড়ে গেছে। সেখানে আন্ডারকাউন্টের একটা ব্যাপার ছিল। এবার শুমারি-উত্তর যাচাই জরিপ করার পর জনসংখ্যার আকার বেড়ে যাবে।
এবার জনশুমারিতে ঢাকার জনসংখ্যাকে কীভাবে পরিমাপ করা হয়েছে সেটা একটা বিষয়। কারণ ঢাকায় অনেক ভাসমান লোক আছে। আবার অনেকেই আছে যারা কাজ করে চলে যায়, তাদের কীভাবে বা কোথায় বিবেচনায় আনা হয়েছে সেটা দেখতে হবে। এজন্য প্রথমে প্রাথমিক শুমারি, দ্বিতীয়ত শুমারি-উত্তর যাচাই জরিপ এবং সর্বশেষ আর্থসামাজিক ও ডেমোগ্রাফিক জরিপ করতে হয়। সেখানে আরও অধিকতর প্রশ্ন থাকবে। সেটাও হয়তো এবার করা হবে। এরপরও প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে।
পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বৈশ্বিক প্রক্রিয়া। আমরা বৈশি^কভাবেই দেখি, নারীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে, পুরুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এটা মূলত বায়োলজিক্যাল কারণ। আমাদের দেশেও মেয়েদের গড় আয়ু কিন্তু ছেলেদের চেয়ে বেশি। আবার পুরুষরা নারীদের তুলনায় বেশি মারা যায়। আবার পুরুষদের ক্ষেত্রে আন্ডারকাউন্টিং হয়েছে কি না সেটাও দেখার বিষয়। মোটা দাগে বৈশি^ক বিবেচনায় পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেড়েছে। আমাদের পাশর্^বর্তী ভারত, চীনেও কিন্তু একই অবস্থা। আমাদের জরিপেও আমরা সেই প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা কমার পেছনে আমরা যদি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের দিক দিয়ে বিবেচনা করি তাহলে দেখব, মুসলিমদের তুলনায় সনাতনদের ফার্টিলিটি রেট কম। মুসলিমদের যেহেতু বেজ পপুলেশন বেশি আর যদি ফার্টিলিটি রেট বেশি হয় তাহলে তাদের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। এরপর আছে মাইগ্রেশন। এখন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যদি মাইগ্রেশন বেশি করে তাহলে এর প্রভাবও জনশুমারিতে পড়বে।
এখন প্রযুক্তির আধুনিকায়ন হয়েছে, প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে কাজ করা হয়। এবারের জনশুমারিতেও সেটা হয়েছে। তবে মূল বিষয় হলো, যারা এই ডিজিটাল শুমারির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারা সঠিকভাবে উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন কি না, সঠিকভাবে সবার বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন কি না, যথাযথভাবে মনিটরিং হয়েছে কি না সেটা আমাদের দেখতে হবে। এবার জনশুমারিতে ৩৫টির মতো প্রশ্ন ছিল সেগুলোর কতটি উত্তর নেওয়া হয়েছে সেটিও দেখার বিষয়। তবে ম্যানুয়ালি দ্রুত ফল দেওয়া যায় না। তাই ডিজিটালের বেশ কিছু অ্যাডভান্টেজ আছে, কিন্তু কাজটা কতটা সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়েছে সেটা দেখার বিষয়।
জরিপের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো কাউকে বাইরে রাখা যাবে না, সবাইকে গণনার মধ্যে আনতে হবে। তবে এখন যেটা করতে হবে শুমারি-উত্তর যাচাই জরিপ যথাযথভাবে করতে হবে। কী পরিমাণ মানুষ বাদ পড়েছে, তাদের এখন নতুন করে যোগ করতে হবে। তাহলে দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা পাওয়া যাবে।
লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান।
অনুলিখন : শরীফুল আলম সুমন