নিজ ভূমে সেরায় চোখ ব্রিটিশদের

১৮৯১ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত দেশগুলোকে একাট্টা করার লক্ষ্যে অ্যাশলে কুপার প্রস্তাব দিয়েছিলেন প্রতি চার বছর অন্তর ক্রীড়া উৎসব আয়োজনের। দুই দশক পর তার প্রস্তাবনায় বাস্তব রূপ পায় ১৯১১ সালে পঞ্চম জর্জের রাজ্য অভিষেক উপলক্ষে লন্ডনে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে ইন্টার-অ্যাম্পেয়ার চ্যাম্পিয়নশিপ। কালে কালে নাম বদলে এই আসর হয়েছে কমনওয়েলথ গেমস। ১১০ বছর আগে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যে পথচলা শুরু, সেই যুক্তরাজ্যেরই আরেকটি শহরে আজ শুরু হবে ১১ দিনের ক্রীড়াযজ্ঞ। গেমস ফিরছে নিজ ভূমে।

কমনওয়েলথে চীন-যুক্তরাষ্ট্র নেই বলে লড়াইটা নেমে আসে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডে। আসরটিতে এ দুই দেশ যেন পদক তালিকায় ওপরে থাকবে এবং এটাই নিয়ম। গত ২২টি আসরে সাতবার পদক তালিকায় ওপরে ছিল ইংল্যান্ড। তবে সর্বোচ্চ ১৩ বার সেরা অস্ট্রেলিয়া। ইতিহাস বলছেÑ পদক তালিকায় লড়াইয়ে কমনওয়েলথে সেরা অস্ট্রেলিয়া। এখন পর্যন্ত মোট ৯৩২টি স্বর্ণ, ৭৭৫টি রৌপ্য ও ৭০৯টি ব্রোঞ্জ জিতেছে তারা। তালিকায় তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড জিতেছে মোট ৭১৪ স্বর্ণ, সমান ৭১৫টি করে রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ। তিন নম্বরে থাকা কানাডা ৪৮৪ স্বর্ণ, ৫১৬ রৌপ্য ও ৫৫৫ ব্রোঞ্জ জিতেছে। ২০১৪ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছিল ইংল্যান্ড। ২০১৮ সালে ঘরের ভেন্যু গোল্ড কোস্টে তা কেড়ে নেয় অস্ট্রেলিয়া। দ্বৈরথ চালু রেখে এবার ইংল্যান্ডের মসনদে ফেরার পালা। নিজ আঙিনায় বলেই পদকের লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়াকে পেছনে ফেলতে মরিয়া স্বাগতিকরা।

আজ সন্ধ্যায় বার্মিংহামের আলেক্সান্ডার স্টেডিয়ামে হবে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এবার রানীর হয়ে গেমসের উদ্বোধন করবেন প্রিন্স অব ওয়েলস চার্লস ফিলিপ আর্থার জর্জ। চার বছর আগের মতো এবারও রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ থাকছেন না উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। তবে আয়োজনের কমতি থাকছে না। ৩৫ হাজার মানুষ মাঠ থেকে সরাসরি দেখার সুযোগ পাবে এই আয়োজন। আর বোকা বাক্সে আয়োজকদের বিশ্বাস ঘরে বসে এই বর্ণিল আয়োজনের সাক্ষী হবে এক বিলিয়ন মানুষ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন ইকবাল খান নামের এক ব্রিটিশ পাকিস্তানি। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে গণিত ও ফিজিক্স নিয়ে পড়া ইকবাল পরে যুক্ত হন থিয়েটারে। হয়ে ওঠেন বার্মিংহ্যামে স্বনামধন্য থিয়েটার পরিচালক। এবারের উদ্বোধনীতে বার্মিংহামের উজ্জ্বল ও ব্যতিক্রমী আত্মবিশ্বাস তুলে ধরা হবে। ওই আলেক্সান্ডার স্টেডিয়ামেই ৮ আগস্ট সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের গেমস।

বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা এবার অংশ নেবেন সাতটি ডিসিপ্লিনে। দুই মাদার ইভেন্ট অ্যাথলেটিক্স ও সাঁতার ছাড়াও ভারোত্তোলন, জিমন্যাস্টিকস, কুস্তি, বক্সিং ও টেবিল টেনিসে থাকবে বাংলাদেশিদের প্রতিনিধিত্ব। এসব খেলায় বৈশ্বিক কোনো আসরে একবারই পদক জিতেছিল বাংলাদেশ। ১৯৮৬ সিউল এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ প্রথম অংশ নিয়েছিল। সেবারই দেশকে গর্বিত করেন বক্সার মোশাররফ হোসেন। জিতে নেন ব্রোঞ্জপদক। এশিয়াডে ব্যক্তিগত পদক ওই একটাই। এরপর যা কিছু মিলেছে তা কাবাডি ও ক্রিকেটের সুবাদে। কমনওয়েলথ গেমস পুরোটা জুড়েই শুটারদের সাফল্যের গল্প। তো মাবিয়া আক্তার, প্রবাসী ইমরানুর রহমান, আলী কাদের হক, কিংবা হাই জাম্পার মাহফুজুর রহমান, উম্মে হাফসা কতটা কী করতে পারবেন তা নিয়ে সন্দেহ আছে নিজেদের মধ্যেও। কমনওয়েলথ গেমসে অংশ নিতে বার্মিংহামে পৌঁছেছেন বাংলাদেশের ১৯ ক্রীড়াবিদ। ২৯ জন ক্রীড়াবিদ ও ২১ জন অফিশিয়াল নিয়ে ৫০ সদস্যের বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের নেতৃত্ব দেবেন বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুর রকিব মন্টু।

১৯ ডিসিপ্লিনের ২৮০ পদকের জন্য লড়বে ৭২ দেশের পাঁচ হাজারের মতো ক্রীড়াবিদ। গেমস ভিলেজ তৈরি করা হয়েছে তিন জায়গা নিয়ে। বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়্যারউইক বিশ্ববিদ্যালয় ও ন্যাশনাল এক্সিবিশন সেন্টারের (এনইসি) হোস্টেলগুলোকে তৈরি করা হয়েছে ভিলেজ হিসেবে। মূল ভিলেজ বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবেন ২৮০০ ক্রীড়াবিদ, ওয়্যারউইকে ১৯০০ জন আর এনইসিতে ১৬০০ জন। 

যুক্তরাজ্যের এই আয়োজন তখনই পূর্ণতা পাবে যখন তারা অস্ট্রেলিয়াকে হটিয়ে সেরা হতে পারবে। গেলবার ৮০ স্বর্ণপদকসহ ১৯৮টি পদক জিতে সেরা হয় অস্ট্রেলিয়া। ৪৫টি স্বর্ণপদকসহ ১৩৬টি পদক জিতে হয় দ্বিতীয়। এবারও তাদের মূল প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া।

হয়তো পদক তালিকার সেরার লড়াইয়ে এখনো যেতে পারেনি, তারপরও গত কয়েক আসরেই ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছে ভারত। গতবার ২৬ স্বর্ণপদকসহ ৬৬টি পদক জিতে তারা হয়েছিল তৃতীয় সেরা দেশ। এবারও তাদের লক্ষ্য নিজেদের ছাড়িয়ে যাওয়ার।