মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা ও নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে খুলনার বটিয়াঘাটার ছয় রাজাকারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকরের রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেয়। বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য বিচারপতি আবু আহমেদ জমাদার ও বিচারপতি কেএম হাফিজুল আলম।
দন্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন বটিয়াঘাটার আমজাদ হোসেন হাওলাদার, শহর আলী শেখ, মো. আতিয়ার রহমান শেখ, মো. মোতাসিন বিল্লাহ, মো. কামালউদ্দিন গোলদার ও মো. নজরুল ইসলাম। নজরুল ইসলাম মামলার শুরু থেকেই পলাতক। অন্য পাঁচ আসামিকে গতকাল রায়ের সময় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। ২০৩ পৃষ্ঠার রায়ের সাজার অংশটি পড়ে শোনান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম।
সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে গত ২২ মে মামলার রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। রায়ে আসামিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা চারটি অভিযোগের সব প্রমাণিত হওয়ায় এ দ- দেওয়া হয়েছে। আসামি আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগে ফাঁসি এবং দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগে ছয় আসামির সবাইকে ফাঁসি দেয় ট্রাইব্যুনাল।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধা হত্যাসহ গণহত্যার অপরাধ করেছিলেন আসামিরা। আসামিপক্ষ বলেছে, তারা ন্যায়বিচার পাননি। আসামিদের খালাস চেয়ে আপিল করা হবে।
ছয় আসামির বিচার : মুক্তিযুদ্ধের সময় বটিয়াঘাটার বিভিন্ন এলাকায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটজনের বিরুদ্ধে (বিচারের আগে দুই আসামির মৃত্যু) ২০১৫ সালের ১৫ নভেম্বর তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। ২০১৭ সালের ৩ মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। তদন্ত শেষে প্রসিকিউশন শাখায় প্রতিবেদন দাখিল করা হয় ২০১৭ সালের ২৫ মে। তদন্ত চলাকালে আশরাফ শেখ ও অভিযোগ গঠনের আগে মো. মোজাহার আলী শেখ মারা যাওয়ায় মামলা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ১৯ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। ওই বছরের ১৩ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ১৭ জনের সাক্ষ্য নেওয়া শেষ হয় ২০২০ সালের ৫ মার্চ। ২০২১ সালের ২১ নভেম্বর মামলার শেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি শুরু হয়ে তা শেষ হয় গত ২২ মে। প্রসিকিউশন পক্ষে শুনানিতে ছিলেন প্রসিকিউটর মোখলেছুর রহমান বাদল ও সাবিনা ইয়াসমিন মুন্নী। কারাগারে থাকা আসামিদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আবদুস সাত্তার পালোয়ান। পলাতক নজরুলের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সাবিনা ইয়াসমিন মুন্নী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা হত্যা ও গণহত্যার মতো জঘন্য অভিযোগ রয়েছে। আমরা তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।’
আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুস সাত্তার পালোয়ান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৭ সাক্ষীর বেশিরভাগ বলেছেন, তারা আসামিদের চেনেন না। আমাদের মনে হয়েছে, তদন্ত সংস্থা তাদের (আসামিদের) শত্রুপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অভিযোগ এনেছে। আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। খালাস চেয়ে আপিল করা হবে।’
পলাতক আসামির আইনজীবী গাজী তামিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তি উপস্থাপন করে বলেছি, মুক্তিযুদ্ধের সময় আসামির (নজরুল) বয়স ছিল ১৩ বছর। এ বয়সের একজন লোক এ ধরনের অপরাধে সম্পৃক্ত হতে পারেন না। আসামি গ্রেপ্তার হলে কিংবা আত্মসমর্পণ করলে আপিল করা হবে।’
যেসব অভিযোগে সর্বোচ্চ সাজা : প্রথম অভিযোগে ১৯৭১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আমজাদ হোসেন হাওলাদারসহ বেশ কয়েকজন বটিয়াঘাটার মাছালিয়া গ্রামে হামলা চালিয়ে বিনোদ ম-লকে অপহরণ করে নির্যাতন চালায় ও পরে গুলি করে হত্যা করে। এ অভিযোগে আমজাদকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর বটিয়াঘাটার পূর্বহালিয়া গ্রামে হামলা চালিয়ে হরিদাস মজুমদারকে নির্যাতন ও গুলি করে হত্যা করে আসামিরা। এ অভিযোগে ছয় আসামির সবাইকে সর্বোচ্চ দন্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
তৃতীয় অভিযোগ অনুসারে মুক্তিযুদ্ধের সময় ২১ অক্টোবর বটিয়াঘাটার সুখদারা গ্রামে হামলা চালিয়ে আসামিরা গণহত্যা চালায়। সে সময় অতুল রায়, জ্ঞানেন্দ্রনাথ, হরিলাল ও ললিত মন্ডলকে হত্যা করে তারা। এ অভিযোগে ছয় আসামির সবাইকে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
চতুর্থ অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর আসামিরা বটিয়াঘাটার বারোআড়িয়া গ্রামে হামলা চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধা জ্যোতিষ মন্ডল এবং আবদুল আজিজকে গুলি করে হত্যা করে। এ অভিযোগে ছয় আসামির সবাইকে মৃত্যুদন্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।