চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ওয়ানস্টপ ইমারজেন্সি কেয়ারের সামনে আর্তনাদ করছেন নিহত সজীবের বাবা মোহাম্মদ হামিদ। তার পাশেই বসে বড় ভাইকে কোনোভাবে ফিরিয়ে দিতে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছিল হামিদের ছোট ছেলে তৌসিফ। ভাঙা কণ্ঠে হামিদ বলেন, ‘আমি একটি মুদি দোকানে চাকরি করি, বেশি পড়ালেখা করার সুযোগ পাইনি। বড় ছেলেকে ধারদেনা করে পড়াশোনা করাচ্ছিলাম। যে ছেলে আমার পরিবারের হাল ধরার কথা, তার লাশ কিনা আমাকেই কাঁধে তুলতে হচ্ছে। আমাদের পরিবারের স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।’
গতকাল শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনা এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসে থাকা নিহত যাত্রীদের একজন জিয়াউল হক সজীব।
ছেলেকে হারিয়ে বাবা হামিদ বিলাপ করতে করতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওরা তিন বন্ধু মিলে বিভিন্ন জায়গা থেকে কিস্তিতে টাকা তুলে তিন মাস আগে একটি কোচিং সেন্টার চালু করে। সেই কোচিংয়ের সবাইকে নিয়ে তারা বেড়াতে গিয়েছিল মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়ায়। কিন্তু বেড়াতে বের হয়ে ট্রেনের ধাক্কায় সজীব ফিরল লাশ হয়ে। ওমরগণি এমইএস বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গণিত বিভাগের প্রথম বর্ষে পড়ত সে, কিন্তু টাকার অভাবে দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হতে দেরি হচ্ছিল। তাই পড়ালেখা চালাতে টিউশনি করাত। এলাকায় টিউশনি ও ব্যাচেও অনেককে পড়াত। সবাইকে খুব স্নেহ করত আমার সজীব।’
কথা শেষ করার আগেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন সজীবের বাবা। একটু ধাতস্থ হয়ে তিনি বলেন, ‘আগের দিন রাতে সে যখন আমাকে পিকনিকে যাওয়ার কথা বলে তখনও আমি তাকে মানা করেছিলাম, পরে আমাকে বলে তারা কোচিংয়ের সবাই মিলে যাবে। তাই তাকে বাধা দেইনি। তাকে বাধা দিলে আজ সে আমার কাছেই থাকত। আমি কী জবাব দেব তার মাকে। কীভাবে তার সন্তানকে এনে দেব? সকালে বের হওয়ার আগেও আমার থেকে বিদায় নিয়ে গেল। বলল ফিরে এসে বেড়ানোর গল্প শোনাব। এই যে শেষ কথা, সজীবের সঙ্গে আর কথা হলো না।’
এদিকে থামছিল না সজীবের ছোট ভাই তৌসিফের চিৎকার। বারবার বলছিল, ‘ও ভাই, ফিরে আয়, তুই চলে আয়। আমার তোকে চাই, তোর মোবাইল আমার লাগবে না। তুই ভাই ফেরত আয়। আম্মাকে আমি কী বলব?’
সজীবের এলাকার বন্ধুরা বলেন, ‘সবসময় হাসিখুশি থাকত সে। পরিবারের হাল ধরতে নানা রকম চেষ্টা করে সজীব, রাকিব, জিসান ও রেদওয়ান কোচিং সেন্টারটি চালু করে। সেখানে তার এবং আমাদের পরিচিত অনেকেই ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু এই কোচিংয়ের আর কোনো শিক্ষকই বেঁচে রইল না।’
গতকাল শুক্রবার মিরসরাইয়ে খৈয়াছড়া ঝরনা ভ্রমণ শেষে রেললাইন পার হওয়ার সময় মাইক্রোবাসে ট্রেনের ধাক্কায় সজীবসহ ১১ যাত্রী নিহত হন। স্থানীয়রা জানান, রেললাইন পার হওয়ার সময় মাইক্রোবাসটিকে ধাক্কা দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার সামনে নিয়ে যায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে আসা মহানগর প্রভাতী ট্রেন। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কর্মকর্তা আনসার আলী জানান, ট্রেনটি বড়তাকিয়া স্টেশন পার হওয়ার সময় লেবেল ক্রসিংয়ের বাঁশ ঠেলে রেললাইনে উঠে যায় মাইক্রোবাসটি। এতে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।