লোডশেডিংয়ে দিনাজপুরে চালের উৎপাদন কমেছে

দেশের শীর্ষ ধান ও চাল উৎপাদনকারী জেলা দিনাজপুর। এখানে উৎপাদিত ধান-চাল জেলার চাহিদা মিটিয়ে অন্য জেলায়ও সরবরাহ করা হয়। আমন মৌসুম শেষে বাজারে নতুন ধান ওঠার কথা থাকলেও পর্যাপ্ত ধান মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন মিল-মালিকরা। লোডশেডিংয়ের কারণে জেলার মিলগুলোতে চালের উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে।

চালের দামে এর প্রভাব পড়ছে। দিনাজপুরের সবচেয়ে বড় চালের বাজার ‘বাহাদুর বাজার এনএ মার্কেট’। সে মার্কেট ঘুরে জানা গেছে, ৫০ কেজি ওজনের বস্তার মিনিকেট চাল ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২শ, আটাশ জাতের চাল ২ হাজার ৬শ থেকে ২ হাজার ৭শ, ঊনত্রিশ জাতের চাল ২ হাজার ৪শ থেকে ২ হাজার ৫শ, সুমন স্বর্ণ ২ হাজার ৪শ থেকে ২ হাজার ৫শ, গুটি স্বর্ণ ২ হাজার ১শ থেকে ২ হাজার ২শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মিলার ও চাল ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, জুলাই মাসের শুরু থেকে চালের দাম একই রয়েছে। তবে সামনে চালের দাম বাড়তে পারে। চালের দাম বাড়ার তিনটি কারণ দেখছেন তারা। এক. লোডশেডিংয়ের ফলে প্রত্যেক মিলে উৎপাদন ব্যয় কমপক্ষে ২০ শতাংশ বেড়েছে, দুই.  বাজারে আমন মৌসুমের ধান প্রায় শেষের দিকে, যে ধান বাজারে উঠছে মজুদদাররা তার দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন, তিন. শুধু ধান থেকে চালের উৎপাদন কমেছে ৫০-৫৮ শতাংশ।

ভারত থেকে যে চাল আমদানি করা হচ্ছে ডলারে তার দাম বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ। ভারতে চালের দাম কমলেও ডলারে পরিশোধযোগ্য দাম বাড়ায় চালের দাম বেড়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ।

চাল-ব্যবসায়ী আলাল বেপারি জানান, এমনিতেই আমন মৌসুম চলছে, আবার বাইরে থেকে চাল আমদানি করা হচ্ছে। ফলে বাজারে চালের দাম কমার কথা। কিন্তু বাজারে গত ১০ দিনের তুলনায় চালের দাম বস্তাপ্রতি ৬০-৭০ টাকা বেড়েছে।

দিনাজপুর ‘চাল ব্যবসায়ী মালিক সমিতি’র সভাপতি আজগার আলী জানান, ‘আমরা মনে করেছিলাম, বাইরে থেকে যেহেতু চাল আমদানি করা হচ্ছে, সেহেতু দেশের চালের দাম কমার কথা। কিন্তু চালের দাম আগের মতোই রয়েছে।’ 

দিনাজপুরে মিলের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। প্রায় ৩০০ অটো রাইস মিল রয়েছে। এসব মিল থেকে ধানের মৌসুমে প্রতিদিন ৭-৮ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়। বর্তমানে বাজারে ধানের আমদানি নেই। মিলগুলোতে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ হাজার টন চাল উৎপাদন হচ্ছে। ধান থেকে চালের উৎপাদন কমেছে ৫০ থেকে ৫৮ শতাংশ।

অটো রাইস মিলে ধান থেকে চাল উৎপাদনে প্রায় ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ (জেলায় মোট বিদ্যুতের) ব্যবহার করা হয়। সাম্প্রতিক লোডশেডিংয়ের কারণে মিলগুলো অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে। ফলে চাল উৎপাদন কমেছে। আবার লোডশেডিংয়ের কারণে মেশিনপত্র নষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাব চাল উৎপাদনের খরচের ওপর পড়ছে। চাল-উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।

গত বছর ভারত থেকে চাল আমদানিতে দাম পড়ত প্রতিটনে ৩২৫ ডলার। বর্তমানে তা কমে ৩০০ ডলারে নেমেছে। টনপ্রতি দাম কমেছে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। গতবছর ভারতে ডলারের পরিশোধমূল্য ছিল ৮৬ টাকা, বর্তমানে ১০১ টাকা। এক বছরে ডলারের পরিশোধমূল্য বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ। ফলে ভারতের বাজারে চালের দাম কমলেও আমদানি করা হলে দেশের চালের দামের চাইতে বেশি পড়ছে ভারতীয় চালের দাম।

বাংলাদেশ অটো, মেজর ও হাসকিং মিল মালিক সমিতির সহ-সভাপতি সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন বলেন, ‘লোডশেডিং বেড়েছে। এতে আমাদের উৎপাদন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। মেশিনপত্রও নষ্ট হচ্ছে। বাজারে ধানের সরবরাহ খুব কম। মজুদদাররা ধানের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকার ভারত থেকে চাল আমদানির অনুমতি দিলেও ডলারের মূল্য অনেক বেড়েছে। ফলে চাল আমদানি করা হলে দেশের চালের দামের চেয়ে ভারতীয় চালের দাম বেশি পড়ছে। অনেক আমদানিকারকই চাল আমদানি করছেন না বা করলেও কম করে করছেন। এজন্য ধারণা করা হচ্ছে, চালের দাম বেড়ে যেতে পারে। আমরা চাই, কোনোভাবেই তা যেন না হয়। ডলারের পরিশোধমূল্য এবং লোডশেডিং কীভাবে কমানো যায় তা সরকার দেখবে বলে আশা করি।’ 

দিনাজপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কামাল হোসেন বলেন, ‘ডলারের মূল্য প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে। চাল আমদানির অনুমতি তো নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য দেওয়া হয়েছে।’