তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারে বেড়েছে মানব পাচার

তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারে সারা বিশ্বেই বেড়েছে মানব পাচার। বাংলাদেশেও ফেইসবুক, টিকটক, ম্যাসেঞ্জার ও ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যমে আকর্ষণীয় প্রচারে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে দেশে লাখ লাখ বেকার তরুণ-তরুণীকে। এভাবেই তাদের পাচার করা হচ্ছে ইতালিসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে। বিশেষ করে করোনা মহামারী পরিস্থিতিতে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। মানব পাচার চক্র দেশের অর্থও অবৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশে পাচার করছে। বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গতকাল শনিবার ঢাকায় আয়োজিত সেমিনারে বক্তাদের কাছ থেকে এ অভিমত এসেছে।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আইওএম (ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব মাইগ্রেশন) আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা আরও বলেন, মানব পাচার রোধে পাচারকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্বের উন্নত দেশগুলোকে মানব পাচার রোধে এগিয়ে আসতে হবে।

আলোচনা সভায় জানানো হয়, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বিদেশ যান, যাদের অনেকেই পাচারকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। কোনো কোনো অভিবাসী ঋণ, জোরপূর্বক শ্রম, যৌন শোষণ, জোরপূর্বক বিয়ে এবং আধুনিক দাসত্বের শিকার হন। 

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘মানব পাচার একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। এর প্রতিরোধে শূন্য সহিষ্ণু নীতি দেখাচ্ছে সরকার। আমরা এ ভয়াবহ অপরাধের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছি। পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সবপক্ষের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। মানব পাচার প্রতিরোধে অনলাইনে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকার কাজ চালিয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশ চায় তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানব পাচার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা প্রযুক্তির ব্যবহার করে মানব পাচার রোধ করতে পারি।’

মানব পাচার প্রতিরোধে চারটি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর যথাযথ পদক্ষেপ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে মানব পাচারকারীদের শনাক্ত ও অভিযান পরিচালনা করতে হবে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মানব পাচার একটি আন্তঃসীমান্ত বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ। প্রযুক্তির মাধ্যমে মানব পাচারকারীরা আরও বেশি ক্ষতি করে। তবে সরকারি সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে পাচারকারীর প্রচেষ্টাকেও প্রতিহত করতে পারেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করছি, জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সনদ ও উদ্যোগের মাধ্যমে মানব পাচার প্রতিরোধ করব।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আখতার হোসেন বলেন, ‘প্রযুক্তির ফলে সহজে অপরাধীরা পাচারের জন্য মানুষকে খুঁজে পায়, প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাদেরও উচিত তাদের বিরুদ্ধে কাজ করা। পাচারের শিকার ব্যক্তিরা শারীরিক ও মানসিক সহিংসতার শিকার হন। তারা হয়রানি, জোরপূর্বক শ্রম, জোরপূর্বক, অবৈধ বিয়ে ও মৃত্যুর মতো পরিস্থিতিতে পড়েন।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমেদ মুনিরুস সালেহীন বলেন, ‘মানুষ কেন জীবন বিসর্জন দিয়ে ইতালি যাচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে। আসলে পাচারকারীরা তাদের উদ্বুদ্ধ করে। ইতালি যাওয়ার জন্য যদি বৈধ পথ খোলা থাকত, তাহলে এভাবে মানব পাচার হতো না।’

বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটার্টন ডিকসন বলেন, ‘মহামারীর কারণে মানব পাচারের সংখ্যা বেড়েছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেরও অন্যতম সমস্যা মানব পাচার। পাচার রোধে আমরা বাংলাদেশকে বিভিন্নভাবে সাহায্য ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। আমরা প্রায় ৩০ হাজার নারীকে অবৈধভাবে পাচার রোধে প্রশিক্ষণ দিয়েছি।’

বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত নাথালি চুয়ার্ড বলেন, ‘মানবপাচার রোধে সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশ সরকার ১২ বছর একসঙ্গে কাজ করছে।’

জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইস বলেন, ‘পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে প্রযুক্তি অনেক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। মানব পাচার নির্মূলের প্রচেষ্টায় ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য আইন প্রয়োগকারী এবং অপরাধমূলক বিচার ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

আইওএম বাংলাদেশের মিশনপ্রধান এবং বাংলাদেশ ইউএন নেটওয়ার্ক অন মাইগ্রেশনের সমন্বয়কারী আবদু সাত্তর এসয়েভ বলেন, ‘ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিরাপদ ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম করলে মানব পাচারের ঝুঁকি কমবে। মানব পাচার দমন এবং প্রতিরোধে সহায়তার জন্য টেকসই প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধানে বেসরকারি খাতের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বেসরকারি খাতের উদ্ভাবন ও দক্ষতা কাজে লাগাতে পারি।’

অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের চার্জ ডি অ্যাফেয়ার্স জেরেমি ওপ্রিটেসকো ও বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি চিফ অব মিশন স্কট ব্র্যান্ডন উপস্থিত ছিলেন।