অপরাধে জড়ানো কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যাতে চাইলেই বিদেশে যেতে না পারেন, সে জন্য বিশেষ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সরকারি আদেশের (জিও) ক্ষেত্রে সুপারিশের বিষয়ে কড়াকড়ি করতে যাচ্ছে সংস্থাটি। ইতিমধ্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বরত মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছে বেবিচক।
ছুটি নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পর আর ফিরে না আসা সংস্থার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহীদুজ্জামান ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল খালেকের বিষয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বেবিচক এই উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এ দুজন যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় অবস্থান করছেন। টেন্ডার, তদবির ও নিয়োগ-বাণিজ্য করে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে তারা দুজন দেশ ছেড়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) নির্বাহী প্রকৌশলীর বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। এই দুজনের অপরাধকান্ড ও দেশ ছাড়ার বিষয়ে দেশ রূপান্তর দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
বেবিচক চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণে কড়াকড়ি আরোপের ব্যাপারে কয়েক দফা বৈঠকও করেছেন।
জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিনা নোটিসে বেবিচকের দুই কর্মকর্তার বিদেশে পালানোর বিষয়টি আমরা ভালোভাবে নিইনি। তারা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। শুধু বরখাস্ত, বিভাগীয় মামলা বা ডিমোশন দিয়ে কাজ হবে না। আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের বিরুদ্ধে আর কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।’
পলাতক দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর হতে বিশেষ বার্তা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ব্যক্তিগত কাজে যে কেউ বিদেশ যেতে চাইলে তার পুরো আমলনামা খতিয়ে দেখবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তারপর জিওর বিষয়টি সামনে আসবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, জিওর ক্ষেত্রে কড়াকড়ি করা হলে যে কেউ বিদেশ যেতে পারবেন না। ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে বিশেষ ছুটি নিতে চাইলে তা পাবেন না। তবে সরকারি কাজে যেতে পারবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর জন্য পুরো বেবিচককে দায়ী করা হয়। নানা অপকর্ম করে তারা ছুটির নাম করে বিদেশে পালিয়ে যান। দুই কর্মকর্তার বিষয়টি সামনে আসায় কর্তৃপক্ষের টনক নড়েছে। যে কেউ আবেদন করলেই জিও পেয়ে যাবেন, তা হতে পারে না। জিও পাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে তারা কঠোর হচ্ছেন। আগামী সপ্তাহে মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি দিয়ে এ বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, অনেক কর্মকর্তা আছেন, তদবির করে জিও নিচ্ছেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল খালেক ও শহীদুজ্জামানের বেলায়ও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি তাদের বিদেশ যাওয়া নিয়ে তারা আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু তদবিরের কারণে তাদের ২১ দিনের ছুটি দিতে হয়েছে। খালেক ও শহীদুজ্জামান মিথ্যা তথ্য দিয়ে মন্ত্রণালয় ও বেবিচককে ‘বোকা’ বানিয়েছেন।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, যারা অপরাধে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বেবিচকের দুই কর্মকর্তার বিদেশে পালানোর বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জিও দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিষয়ে বিস্তারিতভাবে খোঁজ-খবর নেওয়া হবে।
ওই কর্মকর্তা জানান, ইতিমধ্যে বেবিচক তাদের জানিয়েছে, ব্যক্তিগত কাজে কেউ যাতে জিও না পায়, সেদিকে কঠোর হওয়ার বিষয়টি আমলে নিতে। মন্ত্রণালয়ও ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। এ নিয়ে মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে কথা হয়েছে। জিওর ব্যাপারে আরও কড়াকড়ি করতে একটি বিশেষ বার্তা পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, বেবিচকে অপরাধ ঠেকাতে নতুন করে পরিকল্পনা নিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ও বেবিচক। অপরাধী সিন্ডিকেটকে ভেঙে দিতে যা যা করা দরকার, তা করার কথা ভাবছে। দুর্নীতিসহ অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকায় যাদের নাম এসেছে, তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তালিকাটি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছে বেবিচক।