আফগানিস্তানের কাবুলে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় জঙ্গি সংগঠন আল-কায়দার শীর্ষ নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরি নিহত হয়েছেন। গত রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র ড্রোন থেকে নিক্ষিপ্ত হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জাওয়াহিরি নিহত হন।
স্থানীয় সময় গত সোমবার রাতে হোয়াইট হাউজ থেকে দেওয়া এক ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আনুষ্ঠানিকভাবে আল-কায়দার শীর্ষ নেতাকে হত্যার কথা জানিয়েছেন।
আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন ২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডো হামলায় নিহত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক এ সন্ত্রাসী সংগঠনের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় আঘাত।
কাবুলের তথাকথিত একটি সেফ হাউজের বারান্দায় জাওয়াহিরিকে হত্যার পর আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় বাইডেন বলেছেন, ‘এখন ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলো, সন্ত্রাসী নেতা আর নেই। বিশ্ববাসীকে আর এই ভয়ংকর, গোঁয়ার হত্যাকারীকে ভয় পেতে হবে না। যুক্তরাষ্ট্র এভাবেই আমেরিকার জনগণের ক্ষতি করার চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে সংকল্প এবং নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রদর্শন করে যাবে।’
এদিকে এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকার। তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ এক বিবৃতিতে কাবুলে চালানো ড্রোন হামলাকে ‘দোহা চুক্তির লঙ্ঘন’বলে মন্তব্য করেন।
নিহত আয়মান আল-জাওয়াহিরিকে ওসামা বিন লাদেনের ডান হাত আর আল-কায়েদার মূল চিন্তাবিদ বলে মনে করা হতো। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জাওয়াহিরিই ছিলেন ১১ সেপ্টেম্বরে টুইনটাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার মূল রূপকার।
জাওয়াহিরি হত্যার বিস্তারিত: যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমের কাছে জাওয়াহিরিকে হত্যার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। নামপ্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, কয়েক বছর ধরে আত্মগোপনে থাকা জাওয়াহিরিকে খুঁজে বের করা এবং হত্যার ঘটনাটি কাউন্টার টেররিজম এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ‘সতর্ক’ ও ‘ধৈর্যশীল’ এবং ‘অটল’ প্রচেষ্টার ফল।
গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন একটি নেটওয়ার্কের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করছিল। তাদের মূল্যায়ন ছিল এই নেটওয়ার্ক জাওয়াহিরিকে আশ্রয় দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার পর গত এক বছর ধরে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দেশটিতে আল-কায়েদার উপস্থিতির ওপর নজর রাখছিল। এ বছর জানা যায়, জাওয়াহিরির পরিবার, তার স্ত্রী, মেয়ে এবং আরও কয়েকজন কাবুলের একটি ‘সেফ হাউজে’ আশ্রয় নিয়েছে। পরবর্তীকালে জাওয়াহিরিকেও ওই সেফ হাউজে শনাক্ত করেন তারা।
চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে এ বিষয়টি জানান। এরপরই হামলার ছক কষা চলতে থাকে। বাড়িটিতে অবস্থানরত জাওয়াহিরির পরিবার এবং অন্যান্য বেসামরিকদের জীবনের সর্বনিম্ন ঝুঁকি বিবেচনা করে কীভাবে নিখুঁতভাবে অভিযান পরিচালনা করা যায় তা পর্যালোচনা করা হয়।
গত ১ জুলাই হোয়াইট হাউজের ‘সিচুয়েশন রুমে’ সিআইএর পরিচালক উইলিয়াম বার্নসসহ মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে বাইডেনের বৈঠক হয়। বৈঠকে বাড়িটির আলো, আবহাওয়া, নির্মাণসামগ্রী এবং অন্যান্য উপকরণ, যা অভিযানের সফলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে; সেসব নিয়ে প্রশ্ন করেন বাইডেন। বৈঠকে কাবুলে হামলার সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি বিশ্লেষণের জন্যও অনুরোধ জানান তিনি।
এরপর গত ২৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একটি চূড়ান্ত বৈঠক ডাকেন। সেই বৈঠকে জাওয়াহিরিকে হত্যা করা হলে ক্ষমতাসীন তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে কেমন প্রভাব পড়বে সে ব্যাপারে আলোচনা হয়। সিচুয়েশন রুমের অন্যদের কাছ থেকে মতামত নেওয়ার পর জো বাইডেন ‘একটি নিখুঁত এবং উপযোগী বিমান হামলার’ অনুমোদন দেন। হামলার আগে জাওয়াহিরিকে সেই সেফ হাউজের বারান্দায় শনাক্ত করেন তারা। আর সেখানেই রবিবার ৬টা ১৮ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ড্রোন থেকে ‘হেলফায়ার’ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে জাওয়াহিরিকে হত্যা করা হয়।
ওয়াশিংটনের ঘোষণার আগে পর্যন্ত জাওয়াহিরি পাকিস্তানের উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা অথবা আফগানিস্তানের ভেতরে অবস্থান করছেন বলে গুঞ্জন ছিল।
আল-কায়দার সম্ভাব্য প্রধান: যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় আয়মান আল-জাওয়াহিরি নিহতের পর জঙ্গি সংগঠন আল-কায়দার হাল ধরতে যাচ্ছেন সংগঠনের আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা সাইফ আল-আদেল। ওসামা বিন লাদেন, জাওয়াহিরির পর আল-কায়দার অন্যতম এই সহ-প্রতিষ্ঠাতাই ‘আমির’ হতে যাচ্ছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, মিসরের সাবেক সেনা কর্মকর্তা আদেলের জন্ম ১৯৬০ অথবা ১৯৬৩ সালে। বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, স্থাপনায় হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ততার দায়ে আদেলও আছেন ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায়। ধারণা করা হয়, সোমালিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ত্বরিৎ হামলার নেপথ্যেও ছিলেন আদেল।