পুলিশের ‘বাড়াবাড়িতেই’ শান্ত ভোলা অশান্ত

দেশের দক্ষিণের দ্বীপ জেলা ভোলার রাজনীতির মাঠে এক দশকে ছিল না কোনো উত্তাপ। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সহাবস্থান চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। যার প্রমাণ মেলে গত রবিবার পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়ে লাইফ সাপোর্টে থাকা জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নূরে আলমের সুস্থতা কামনায় আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে। আহত নূরে আলমের সুস্থতায় দোয়া কামনা করে তাদের দেওয়া অসংখ্য পোস্ট ভাসছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

কেন্দ্র ঘোষিত সব আন্দোলন কর্মসূচি পালনে গত কয়েক বছরে পুলিশের সঙ্গেও বিএনপি নেতাকর্মীদের কোনো বিরোধ দেখা দেয়নি। একধরনের পারস্পরিক সমঝোতার মধ্যেই চলছিল ভোলা জেলা বিএনপির কর্মসূচি। জেলার রাজনৈতিক অভিভাবক হিসেবে পরিচিত প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ। জেলাজুড়ে তার একক আধিপত্য থাকায় এখানে রাজনৈতিক বড় কোনো বিরোধ নেই বললেই চলে। অনেকের মতে, জেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ গোলাম নবী আলমগীরও তোফায়েল আহমেদের স্নেহধন্য। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ করেই কেন উত্তাল হয়ে উঠল জেলার রাজনীতির মাঠ। বিএনপি কর্মীরাই বা কেন পুলিশের ওপর চড়াও হলেন? আবার পুলিশকেও কেনইবা গুলি ছোড়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে? এসব প্রশ্নই এখন ঘুরে ফিরছে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মুখে মুখে।

পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষের পরপরই তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপি সভাপতি গোলাম নবী আলমগীর বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই চায়নি এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক। পুলিশই স্বপ্রণোদিত হয়ে এই ঘোলাটে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।’ অর্থাৎ সংঘর্ষের জন্য আওয়ামী লীগ নয়, পুলিশকেই দায়ী করছেন তারা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তকে বলেন, বিএনপির যেকোনো আন্দোলন কর্মসূচিতেই সাধ্যমতো তারা সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছেন। তবে অতীতে পুলিশের ওপরে কখনো আক্রমণ করা হয়নি। আক্রমণ করার কারণেই পুলিশ সদস্যরা অ্যাকশনে (পদক্ষেপ) যেতে বাধ্য হয়েছে।

পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লোডশেডিং ও জ¦ালানি খাতে ‘অব্যবস্থাপনা’র প্রতিবাদে রবিবার সকাল থেকে জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ কর্মসূচি অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবেই চলছিল। সমাবেশ শেষ করে মিছিলের প্রস্তুতি নিতেই পুলিশ তাতে বাধা দেয় এবং ব্যানার ছিনিয়ে নেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা বাধা উপেক্ষা করে মিছিল করার চেষ্টা করেন। তখন পুলিশও পাল্টা লাঠিপেটা শুরু করলে একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

ওই সংঘর্ষে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আব্দুর রহিম পুলিশের গুলিতে নিহত হন বলে বিএনপি অভিযোগ করলেও পুলিশ এর দায় বিএনপির ওপর চাপাতে চাইছে। পুলিশের দাবি, বিএনপি নেতাকর্মীরা পুলিশ সদস্যদের দিকে অস্ত্র তাক করেছিল, তাই আত্মরক্ষায় তারা গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে বলা যাবে না কার গুলিতে আব্দুর রহিম মারা গেছেন।

ভোলার রাজনীতির মাঠে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এত দিনের সহাবস্থানের চিত্র ফুটে ওঠে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুল কাদের মজনু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোলায় সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। এটা (পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষ) একটি পরিকল্পিত ঘটনা। বিএনপি চাইছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে। তবে কাদের ইন্ধনে এ ঘটনা ঘটেছে, তা অনুসন্ধান করা উচিত।’

রবিবারের সংঘর্ষের বিষয়ে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভোলা সদর থানার এসআই জসীম তার মোবাইল ফোন থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ফরহাদ সরদারের সঙ্গে আমাকে কথা বলিয়ে দেন। তখন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আমাদের কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে চান। বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের কথা জানালে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে করতে বলেন। এর কিছুক্ষণ পরে মিছিল শুরু হলেই সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা না বলে অতি উৎসাহী হয়ে এসআই আরমান, কনস্টেবল আনিছ, মেহেদী, মারুফ, ইলিয়াছসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য বিএনপি কর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে দেয়। এরপর শুরু হয় যুদ্ধক্ষেত্রের মতো গুলিবর্ষণ।’

তবে জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের দাবি, বিএনপি সমাবেশ কিংবা মিছিল কোনোটারই অনুমতি নেয়নি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেহেতু কেন্দ্রীয় কর্মসূচি, তাই আমরা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করি। সমাবেশের পর যখন মিছিল বের হয়, তখন পুলিশ বাধা দিলে মিছিলের পেছনে থাকা একটি উচ্ছৃঙ্খল গ্রুপ পুলিশের ওপর কোল্ড ড্রিংকস ও কাচের বোতল এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশের এক সদস্যকে ধরে নিয়ে পার্টি অফিসের মধ্যে পেটানো হয়। এ ছাড়া শটগানসদৃশ্য অস্ত্র দিয়ে পুলিশের ওপর গুলি করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষায় পুলিশ ৩০ রাউন্ড টিয়ার গ্যাস শেল ও ১৬৫ রাউন্ড শটগানের কার্তুজ ফায়ার করে।’

অবশ্য জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদ ট্রুম্যানের দাবি, কিছু পুলিশ সদস্যের অতি উৎসাহী আচরণে রবিবারের সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের কিছু সদস্যের অতি উৎসাহের কারণে এই ঘটনার (পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষ) সৃষ্টি হয়েছে। এর জন্য তারাই (পুলিশ) দায়ী। এ ঘটনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ঘটনার সময় আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী উপস্থিত ছিল না।’

ভোলায় নিহতের ঘটনায় বগুড়ায় বিএনপির বিক্ষোভ: ভোলায় গুলিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী আব্দুর রহিম নিহতের ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে বগুড়ায় বিএনপির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ সমাবেশ করেন বলে জানিয়েছেন বগুড়া সংবাদদাতা। শহরের নবাববাড়ি সড়কে দলীয় কার্যালয়ের সামনে গতকাল বিকেল ৫টায় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রেজাউল করিম বাদশার সভাপতিত্বে এই সমাবেশ হয়। এর আগে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন।

উল্লেখ্য, লোডশেডিং ও জ¦ালানি খাতে ‘অব্যবস্থাপনা’র প্রতিবাদে গত রবিবার ভোলায় বিএনপি নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। এতে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক কর্মী নিহত এবং পুলিশসহ অর্ধশতাধিক আহত হন। গুরুতর আহতদের মধ্যে জেলা ছাত্রদল সভাপতি নূরে আলমসহ ছয়জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল ও ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।