সৎ হও

পবিত্র কোরআনে সুরা ইয়াসিনের ৮২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ বললেন হও, আর সব কিছু হয়ে গেল (কুন ফাইয়া কুন)। অর্থাৎ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি-রহস্য এভাবেই বলা হয়েছে। কিন্তু মানুষ যখন মানুষকে বলে ‘সৎ হও’, তখন স্রষ্টার ইচ্ছা পূরণ হওয়ার মতো ব্যাপার ঘটে না। যদিও মানুষের সৎ হওয়া না হওয়া তার ইচ্ছার ঐকান্তিকতা ও চিত্তশক্তির ওপর নির্ভরশীল, তবুও সমাজের বাস্তবতা ও চালচিত্রের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল মানুষের সৎ হওয়া বা না হওয়া। তবুও বাস্তবতার নিরিখে বলতে হবে যে, বিরুদ্ধ স্রোতের সাঁতারু সৎ মানুষ অঙ্গুলিমেয় নয়। অবশ্য তারা অপরাজনীতি আর অপকীর্তির ডামাডোলে ক্ষীণপ্রভ হন, তারা সহজে দৃশ্যমান হন না। নইলে কি আর জীবনানন্দ দাশ বলেন, ‘অন্ধ যারা তারাই চোখে দেখে বেশি আজ।’ উপরন্তু সমাজে অসতের দাপটে তারা গুটিয়ে থাকেন, সশব্দ উপস্থিতি তাদের রুচিবোধকে বিঘিœত করে। সুতরাং মানতেই হয় জন লিভগেটের কথা, ‘যে নদী গভীর বেশি, তার বয়ে যাওয়ার শব্দ কম।’ তুলনীয় বাংলা প্রবচন, ফাঁকা কলসির বাজনা বেশি। অগভীর নদী বা ফাঁকা কলসির দৌরাত্ম্যে ও অসৎ মানুষের প্রাবল্যের এই সময়ে এই দেশের চালচিত্র বা হালহকিকত বুঝতে আমি তিনটি কাব্যিক উদ্ধৃতির সাহায্য নিচ্ছি। কবি শামসুর রাহমানের আক্ষেপ যেন হৃদয় মথিত করে ‘‘কে আমাকে বলে দেবে কতদূর গেলে খাঁটি কোনও/মানুষের দেখা পাব? এখন আমার/আশেপাশে খল, ভন্ড আর ষোলোআনা স্বার্থপর।/লোক আসা-যাওয়া করে। যে গাছকে ছায়াময় ভেবে/ঠাঁই নিই ওর নিচে, নিমেষেই সেটি উবে গিয়ে/এক রাশ কাঁটা হয়ে আমাকেই কামড়াতে থাকে।’’

এতো আমাদের নৈমিত্তিক অভিজ্ঞতা, শুধু কবির নয়। মানুষ সৎ হলে আমাদের কবির এমন জীবন-যন্ত্রণা হওয়ার কথা নয়, আমাদেরও নয়। শাসনহীন এদেশে এখন অনাসৃষ্টি কর্মকা- নৈমিত্তিক ব্যাপার। শাসক সৎ হলে এমন সমাজ-বিকার অসম্ভব ছিল। সুতরাং কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতা ‘সৎশাসকের খোঁজে বাংলাদেশ।’ কবির হতাশা‘‘মুখের চাইতে মুখোশই এখন/বাঁশের চাইতে কঞ্চির মতো দড়।/ক্ষমতার মূঢ়-আস্ফালনে,/মাঝেমধ্যে ছোটকেও মনে হয় বড়।/ইহজন্মে এমন শাসন দেখি নাই।’’ বেশ কিছুদিন আগে একটি বাংলা দৈনিকের পাতায় একটি কবিতা পড়ে যেন হৃদয় মথিত হলো। লিখেছেন আমার অজানা তরুণ জ. ই. বুলবুল। কবিতার শিরোনাম ‘অমানুষ কেউ’। বলাবাহুল্য, শিরোনামটি আমাকে আকর্ষণ করেছিল। কবিতাটি হলো‘‘মানুষের দুনিয়ায়/অমানুষ কেউ/যত খায় তত চায়/পেট ভরলেও।/গরিবেরই চোখ খায়/রক্ত ও হাড়/সবকিছু লুটে নিয়ে/করে সংহার/অমানুষ মানুষের/চেয়ে পায় দাম/সমাজের নেতা সে-ই;/থাকুক বদনাম।/পেট যত ভরা থাক।/চোখ ভরে না/যত খায় তত চায়।/খাওয়া মরে না।’’

আমরা কেমন মানুষ এখন তা এই তিনটি কাব্যিক উদ্ধৃতি থেকে বোধগম্য। তবে সৎ মানুষের আকাল তো পৃথিবীর সমান বয়সী। প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক ডিওনিসাস নাকি দিনের বেলায় প্রদীপ হাতে ঘুরে বেড়াতেন। তাকে পাগল ঠাউরে কেউ যদি কারণ জানতে চাইত তিনি উত্তর দিতেন, অমানুষের অন্ধকারে আমি মানুষ খুঁজে বেড়াই। মুসা (আ.)-এর অভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তিনি তার চারপাশে মানুষই দেখতেন, কিন্তু ওয়াইস করনির চশমা চোখে দিয়ে দেখলেন, মানুষগুলো সব জন্তু-জানোয়ার হয়ে গেছে; জন্তু-জানোয়ারের ভিড়ে মানুষ পাওয়া ভার। তবে ইতিহাস ঘাঁটলে সৎ বা ভালো মানুষের দেখা মেলে। গিয়াসউদ্দীন আযম শাহ স্বাধীন সুলতান হিসেবে অবিভক্ত বাংলায় রাজত্ব করেছিলেন ১৩৯৩ থেকে ১৪১০ অব্দি। তার সময়ে আসা চৈনিক রাজদূতরা বাংলার মানুষকে দুটো প্রশংসাপত্র দিয়ে গেছেন। এক, এদেশের মানুষ মিথ্যা কথা বলে না। দুই, কেউ প্রতারণা করে না। আমার নিজের চীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, চৈনিকরা হালকা কথার মানুষ না। যদি তাই হয়, তাহলে প্রায় ছ’শ বছর পর এই বাংলায় এমন মানুষের আকাল হলো কেন? কেনই-বা আমাদের কবিরা এমন হা-পিত্যেশ করেন। বাংলার মানুষের এমন পতিত দশা নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথেরও আক্ষেপ ছিল‘‘পুণ্যে পাপে, দুঃখে সুখে, পতনে-উত্থানে/মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে।’’ বা ভুলি কী করে তাঁর খেদোক্তি-‘‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী,/রেখেছ বাঙালী করে/মানুষ করনি।’’

মানতে রাজি আছি যে, মানুষের বা বাঙালির সততায় ধস নেমেছে। কিন্তু সততা বা সৎ মানুষ বলতে কী বোঝায়? বাংলা আভিধানিক অর্থ, ভালো মানুষ। ভালো মানুষ সে যার সততা আছে। প্রকারান্তরে সততা মানে নীতিনিষ্ঠতা। এডউইন স্যান্ডিস (১৭ শতকে) তৈরি করেছিলেন প্রবচন বাক্য  ‘Honesty is the best policy’ (সততা সর্বোত্তম নীতি)। আর টমাস জেফারসনের ভাষায়, ‘Honesty is the first chapter in the book of wisdom.’ (প্রজ্ঞা নামের বইয়ের প্রথম অধ্যায় সততা)। স্মর্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ এপ্রিল পালিত হয় Honesty Day হিসেবে। সততার গুণগান করেছেন শেক্সপিয়ারও। তার ‘All’s Well that Ends Well’ নাটকে সংলাপ আছে ‘no legacy is so rich as honesty’ (সততার মতো কোনো ঐতিহ্যই এত সমৃদ্ধ নয়)। জীবনের জটিলতা, কাঠিন্য আর বাস্তবতার কারণে বিরুদ্ধ-স্রোতের সাঁতারু হওয়া দৃঢ় ব্রতের ব্যাপার। ক’জনই বা তা পারে? যারা পারে তারা লঘিষ্ঠ; গরিষ্ঠরা গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে জীবন উপভোগ করে, ঘনিষ্ঠজনকে তুষ্টও করে; সৎ মানুষ কাঞ্চন-কৌলীন্যের যুগে যেন অপাঙ্ক্তেয়। এখন তো জীবন মানেই শুভঙ্করের ফাঁক সম্পর্কে জানা, এবং তা পূরণ করার চাতুর্য ধারণ করা। কাজেই এখন সৎ মানুষেরা অসফল; অসৎ মানুষ সফল ইহলোক আর পরলোকের মধ্যে তারা প্রবৃত্তিগতভাবে ইহলোককে বেছে নেয়। ওরা যেন চার্বাকপন্থি হয়ে ওঠে; বলে ঋণ করে হলেও ঘি খাও, খাও-দাও ফুর্তি করো; মরে গেলে কেউ চাইতে আসবে না। বুঝি, ঢাকা শহরে দেয়াল লিখন, ‘কায়দা করে বেঁচে থাকো।’ সৎ মানুষের কাছে এই ‘কায়দা’ অজানা; অথচ অসৎ মানুষের কাছে সব কায়দা জানা। অর্থাৎ কায়দা করে ইহলৌকিক জীবন সমৃদ্ধ করে অসৎ মানুষ। তার মানে অবশ্য এটা নয় যে, সৎ মানুষেরা কালেভদ্রে সফল হবে না।

গোলাম হোসেন সেলিম ১৭৭৭-এ লিখেছিলেন সিয়ার-উল-মুতাখরিন। ফার্সিতে লেখা বইটিতে বাঙালির বিবরণ আছে এভাবে: বাঙালি খায় বেশি, পোশাক পরে অনাকর্ষণীয়ভাবে; আর ঋণ করে অকাতরে, ফেরত দেয় না। কোনো কারণে লেখক বাঙালি-বৈরী হলেও, সত্য-ভাষণ যে তিনি করেননি, তা নয়। যেমন সাম্প্রতিক খেলাপি ঋণের শেকড় তো সন্ধান করতে পারি।

সৎ মানুষের সংজ্ঞায়ন এবং বাঙালি সম্পর্কে কিছু নেতিবাচক কথার পর ঔচিত্যবোধ তাড়িত হয়ে অন্তত একজন সৎ মানুষের কথা বলতে হচ্ছে। তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.)। একদিন সন্ধ্যায় তিনি দুই মোমের আলোয় সরকারি কাজ করছিলেন। এমন সময় দুজন আত্মীয় দেখা করতে এলো। উমর (রা.) তখন দুই মোমবাতি নিভিয়ে এক মোমবাতি জ্বালালেন। আত্মীয় দুজন কারণ জানতে চাইলে তার উত্তর ছিল, দুই মোমবাতি সরকারি অর্থে কেনা, যার আলোয় তোমাদের সঙ্গে আলাপ করতে পারি না। কাজেই নিজস্ব অর্থে কেনা একটি মোমবাতি জ্বালালাম। এটাই হলো সৎ মানুষ ও সৎ শাসকের দৃষ্টান্ত। আমরা কোথায় আছি? অসততার দৌড়ে হারজিত নিয়ে আমাদের এখনকার যাপিত জীবন। সরকারি অর্থ-সম্পদ জনগণ উৎসারিত; তা তো বেমালুম ভুলে যাই। প্রবচন আছে, ‘কোম্পানিকা মাল দরিয়া মে ঢাল’। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার তৃতীয় দুনিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল। মনে রাখতে হবে, সরকারের ব্যয়ের উৎস জনগণ। সংবিধানের ৭ (১) ধারা অনুযায়ী জনগণ প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক। বাস্তব চিত্র ভিন্ন, যা বুঝতে পারি যখন তথাকথিত ভিআইপিদের জন্য সড়কে যান চলাচল বন্ধ করা হয়। এই ব্যবস্থা তো অগণতান্ত্রিক। কিন্তু আমরা কেন অসৎ হলাম। কারণ খুঁজতে হবে। কারণগুলো এমন হতে পারে

১. বিবেকহীনতা: এ প্রসঙ্গে পশ্চিম বাংলার বিরলপ্রজ কবি অজিত প-ার ‘বিবেক’ নামের একটি কবিতা থেকে কিছু পঙ্ক্তি হাজির করছি‘‘বিবেক তুই কোথায়?/কফিনের পেরেকের মাথায়!/ওখানে কেন?/তোমরাই বসিয়েছ আমাকে এখানে।’’ মানুষের তাড়া খেয়ে বিবেকের এমন দশা! উধাও বিবেকের সমাজ তো বিবেকহীন অমানুষের অভয়ারণ্য। এমন বিবেকবর্জিত সমাজে বিবেকী সৎ মানুষের ঠাঁই কোথায়? তবে বিবেকহীনতা সমাজের ওপরতলার সংক্রমণ, যা থেকে তৃণমূলের আমজনতা মুক্ত। নইলে কি আর একজন দরিদ্র রিকশাচালক আরোহীর ভুলে ফেলে যাওয়া মোটা টাকার ব্যাগ অনেক শ্রম দিয়ে খুঁজে-পেতে আরোহীকে ফেরত দেয়? অথবা আরোহী তরুণী যখন ধর্ষণের শিকার হয়, তখন রিকশাচালক পুলিশের সহায়তায় তরুণীকে বিপদমুক্ত করে। উভয় দৃষ্টান্ত বিবেকী মানবতার। অপরদিকে হযরত উমর (রা.)-এর আচরণও ছিল বিবেকী। এই কারণে ঢাকা শহরে রিকশা/সিএনজির পেছনে লেখা থাকে ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদালত বিবেক।’ যথার্থ।

২. শিক্ষায় গলদ: শুধু এদেশে নয়, সারা দুনিয়াতেই শিক্ষার গলদ দৃশ্যমান ও বোধগম্য। সংখ্যাবাচক ব্যাপ্তির সমান্তরালে তৈরি হয়নি গুণমানের স্বস্তিদায়ক গভীরতা। বাংলাদেশের শিক্ষা তো এখন হ-য-ব-র-ল। ফলে কিছু প্রশ্নবিদ্ধ বিদ্যাধারী মানুষ তৈরি হলেও, আলোকিত মানুষ দু®প্রাপ্য। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, শিক্ষা মানুষের সদ্গুণাবলির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এমন শিক্ষানীতি-নৈতিকতাসমৃদ্ধ, যা আমাদের কোনো পর্যায়েই নেই। এখন তো প্রচল শিক্ষার এক লক্ষ্য কর্মমুখী শিক্ষা, যা একেবারেই ভ্রান্ত। শিক্ষা আলোকিত মানুষ গড়বে, নির্মাণ করবে এমন মানবসম্পদ, যা সমাজের কল্যাণ করে। কাজেই রবীন্দ্র-বক্তব্য, ‘বিদ্যা সহজ, শিক্ষা কঠিন। বিদ্যা আহরণের, শিক্ষা আচরণের।’ তবে আচরণের শিক্ষার সূতিকাগার গৃহ। আমি বলি, শিক্ষা মানুষকে দেয় আচরণ, বচন, বসন ও বিচরণ। এই চারটি মাত্রায় শিক্ষিত মানুষকে মাপতে হয়। এমন শিক্ষা নেই বলে শিক্ষিত মানুষের মধ্যে বিবেকহীনতা প্রকট।

৩. চিত্তবিকার: চিত্ত নয়, এখন বিত্তই মোক্ষ। কারুবাসনা নয়, বিত্তবাসনা যেন আমাদের উন্মাদনার আরেক নাম। বিত্তের সঙ্গে বিষয়বাসনাও লক্ষণীয়। আমার কথা না বাড়িয়ে একটি ফেইসবুক-লেখা উদ্ধৃত করছি ‘কিছু মানুষ সুযোগ পেলেই আমাকে টাকার গল্প শোনায়। তার দৈনিক উপার্জন কত, কয়টা বাড়ি এবং গাড়ি, কোন ব্র্যান্ডের ঘড়ি এবং পোশাক আছে ইত্যাদি। কয়টা দেশে গিয়েছেন, কতবার বিজনেস বা ফার্স্ট ক্লাসে বিমান ভ্রমণ করেছেন, এরপরে কোথায় আরও ফ্ল্যাট বা জমি কিনতে যাচ্ছেন ইত্যাদি। জীবনে আসলে কতটুকু প্রয়োজন সেই বোধটুকু এই টাকাওয়ালাদের লুপ্ত হয়ে যায়। সমাজটাও বদলে গেছে। আগে জ্ঞানী ও গুণী মানুষদের ছিল কদর। এখন টাকাওয়ালাদের। সেই টাকা যে সূত্রেই আসুক না কেন, সেটি নিয়ে সাধারণের অত মাথাব্যথা নেই। সুশিক্ষিত (?) মানুষরাও দেখছি বেশি বিত্তের অধিকারীকেই অধিক সফল এবং মর্যাদাবান মনে করে তাদের সঙ্গে সেঁটে আছে। সুশিক্ষিতের সংজ্ঞাও বোধহয় পাল্টে গেছে।... সর্বত্রই সব উপায়ে অর্থ উপার্জনই এখন মুখ্য।’ উল্লেখ্য, লেখাটি আমাদের প্রিয় নজরুলগীতি গায়ক সুজিত মোস্তফার, যে আমার নমস্য ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের সন্তান। শিল্প বিপ্লবোত্তর পশ্চিমের সমাজকে প্রত্যক্ষ করে স্কটল্যান্ডের দার্শনিক অ্যাডাম ফার্গুসন বলেছিলেন, মানুষকে যেন পেয়ে বসেছে  acquisitive individualism; অর্থাৎ আহরণমুখী ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, যা আমাদের সমাজে প্রবিষ্ট। এমন সমাজে সৎ মানুষের চাষ ও ফলন বেশ দুঃসাধ্য ব্যাপার। এছাড়াও অপরাজনীতি ও শাসনহীনতা সমাজের কর্কট রোগ। গত শতকের শেষ দশকের শুরুতে দুর্বৃত্তবিরোধী ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ শুরু হয়েছিল। পত্রিকায় কলাম লিখে আমি বলেছিলাম, আসল প্রয়োজন ‘অপারেশন ক্লিন পলিটিক্স।’ ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ ব্যর্থ; আর ‘অপারেশন ক্লিন পলিটিক্স’ শুরুই হয়নি; আদৌও শুরু হবে কি না জানি না। আমাদের শাসকের সংখ্যা বেড়েছে অনেক, শাসনও কমেছে অনেক। নইলে কি আর কবি নির্মলেন্দু গুণ সৎশাসকের খোঁজে কলম ধরেন। সর্বোপরি, নেতৃত্বের কথাও বাদ যায় না। বাংলার ইতিহাসে আছে গোপাল (৭৫০-৭৮১) মানুষকে প্রায় শতবর্ষের মাৎস্যন্যায় থেকে রক্ষা করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আলাউদ্দীন হুসেইন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯) বাংলার মানুষকে অরাজকতা থেকে রক্ষা করেছিলেন। পরিবেশ-প্রতিবেশ ভালো হলে মানুষ ভালো হয়; আর পরিবেশ-প্রতিবেশ ভালো হয় শাসক ও শাসনের গুণে।

সৎ মানুষের সততা আমাদের সমাজেও আছে; কিন্তু অসৎ মানুষের প্রাবল্যে তারা যেন ক্ষীণপ্রভ। সততা শক্তি, যার ওপর ভর করে শক্তির প্রসার কাম্য সৎ মানুষকে সংখ্যায় স্ফীত হতে হবে। কারণ উইলিয়াম গ্লাডস্টোনের ভাষায় A single courageous man is always a majority. মোদ্দা কথা, মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো আত্মঘাতী হবে। স্মরণ করি রবীন্দ্র-উক্তি, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’ না, অবিশ্বাসীর পাপে পাপী হতে চাই না; তাই শেষ উদ্ধৃতি ফিওদর দস্তয়েভস্কি থেকে : ‘I have seen the truth. I have seen it and I know that people can be beautiful and happy without losing their ability to dwell on this earth. I cannot and will not believe that evil is man’s natural state.’ আমরাও এমন প্রতীতিতে থিতু হতে চাই।

লেখক-বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস্ (বিইউপি)