২০৫০ সালে দেশ থেকে হারিয়ে যেতে পারে কৃষিশ্রমিক

দেশে জনসংখ্যা বাড়ছে, ছোট হচ্ছে কৃষিজমি। ফলে অল্প জমি থেকে বেশি মানুষকে খাওয়ানোর দায়িত্ব পড়েছে কৃষকের ওপর। কৃষিশ্রমিকের স্থান দখলে নিচ্ছে যন্ত্র, যার ব্যবহারে উৎপাদনও বাড়ছে। এতে করে পুরোদস্তুর বাণিজ্যে রূপ নিতে চলেছে কৃষি। সে ক্ষেত্রে একটি গোষ্ঠীর হাতে চলে যাবে এই খাত। ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশ থেকে হারিয়ে যেতে পারে কৃষিশ্রমিক। সেই সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে পারিবারিক খামারও।

গতকাল বাংলাদেশ গবেষণা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) ‘ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স অব দ্য বেঙ্গলি ফ্যামিলি ফার্ম’ গবেষণা প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরেন সোশ্যাল অ্যান্ড পলিসি সায়েন্স বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. জিওফ উড। বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনের সভাপতিত্বে এতে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার. ড. জিল্লুর রহমান প্রমুখ। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই খামার। তাই এখনই এটা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। করতে হবে সুরাহা।

গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের কৃষির বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত হয় বাণিজ্যিক কৃষি খামারিদের মাধ্যমে, যেখানে করপোরেট স্বার্থ কৃষকদের দখল করে নেয়। খাদ্যনিরাপত্তায় পরিবারভিত্তিক খামার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বিশ্বায়নের ফলে কৃষিজমি কমে ছোট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে হারিয়ে যাচ্ছে পারিবারিক কৃষি খামার। কৃষিতে নতুন বৈচিত্র্য এসেছে। সনাতন পদ্ধতির স্থলে জায়গা করে নিয়েছে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ। আমরা যে কৃষিকে চিনতাম আশির দশক থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে একটা বিরাট পরিবর্তন এসেছে। আগে কৃষক যেভাবে নিজের জমি নিজে চাষ করতেন, সেই সনাতনি চরিত্র নেই।

তিনি আরও বলেন, তবে এখানে তিন ধরনের সম্ভাবনা আছে। এর মধ্যে একটা হলো, খামারগুলো ভেঙে যাবে। দ্বিতীয়ত, এর পরিবর্তে বড় বাণিজ্যিক খামারের জন্ম হবে। তৃতীয়ত, সনাতনি রূপটা থাকবে না আবার কমার্শিয়ালও থাকবে না, এর মাঝামাঝি কিছু একটা থাকবে। তবে এখানে কৃষকের জায়গাটা নেবে সার্ভিস প্রভাইডাররা। এতে করে কৃষক পুরোপুরি  কৃষি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। 

তার গবেষণায় উঠে এসেছে বাণিজ্যিক কৃষির কারণে কীভাবে কৃষকরা প্রভাবিত হন। গবেষণায় বলা হয়, চাষাবাদের মৌসুমে কৃষি খামারিদের ভয়ের বিষয় এসে দাঁড়ায় ‘মাস্তানিজম’। এটা বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে বেশি। দেশে কৃষি খাতের ভূমিকা বাড়ছে। কারণ অল্প জমি থেকে বেশি মানুষকে খাওয়াতে হচ্ছে। তাহলে কৃষকের কাজ কি সার্ভিস প্রভাইডাররা পূরণ করতে পারবে? বাংলাদেশে কৃষিকাজে বর্গা জমি বা ভাগ চাষ বেড়ে এটা ২০ থেকে ৪৫ শতাংশ হয়েছে। নতুন একটা গোষ্ঠী কৃষিকাজে এলো। তারা কোন লক্ষ্যে এলো, তা স্পষ্ট নয়। তারা কৃষি খাতকে শোষণ করার জন্য এসেছে কি না, এসব নিয়ে আরও আলোচনার তাগিদ দেওয়া হয় গবেষণায়। আলোচনার মধ্য দিয়ে সুরাহা করতে হবে।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘আমি গ্রামাঞ্চলে মাছের খামারে একধরনের মাস্তানি দেখেছি। কিন্তু শহরে এটি নেই। ৫ থেকে ১০ বছরে এটি কমছে। তবে ভূমি বাণিজ্য কৃষি খামারিদের জন্য আরেকটি সমস্যা। সরকার এটি রোধে কাজ করছে।’

দেশের বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার ম-ল বলেন, মালিকানাকেন্দ্রিক বা পরিবারভিত্তিক যে কৃষি তা হারিয়ে যাচ্ছে। আগে দেখতাম অনেক ধনী কৃষক নিজের জন্য ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি অন্যের জন্যও ফসল ফলাতেন। এখন তাতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। একদিকে জমি খ- খ- হচ্ছে, অন্যদিকে এ খাতে নতুন নতুন উদ্যোক্তা আসছেন; বিশেষ করে গ্রামীণ তরুণেরা কৃষিজমিতে কাজ করছে।’

ছোট জমিতে প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসঙ্গে কৃষি অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আমাদের ধারণা ছিল বড় যন্ত্র ব্যবহার করতে হলে বড় পরিসরে জমি দরকার। তাহলে কী হবে কৃষির! এটা নিয়ে বড় শঙ্কায় পড়ে গিয়েছিলাম। আমরা মনে করছিলাম যন্ত্র দক্ষ ব্যবহার করতে হলে বড় জমি লাগবে। তবে আমি বাংলাদেশে একটা ভিন্নতা দেখিছি। এটা আমরা নিজেদের জন্যই করেছি। এমন প্রযুক্তি আছে জমি ছোট হলেও ব্যবহার করা যাবে।’

বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অংশ নেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান প্রমুখ।