ভোলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নূরে আলম মারা গেছেন। গতকাল বুধবার বেলা ৩টার দিকে রাজধানীর গ্রিনরোডের কমফোর্ট হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। নূরে আলমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজধানী ঢাকা ও ভোলায় বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ভোলা শহরে হয় বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ। এ সমাবেশ থেকে আজ বৃহস্পতিবার ভোলা জেলাজুড়ে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
এদিকে নূরে আলমের মৃত্যুর খবর শুনে গতকাল বিকেলে বিএনপি এবং এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে সেøাগান দিতে থাকেন। ছাত্রদল নেতার মৃত্যুর খবরে গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘ভোলায় বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি করে হত্যা সরকারের এক অশুভ পরিকল্পনার অংশ।’
নূরে আলমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভোলা শহরজুড়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। জেলা বিএনপি কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হয়। সমাবেশ থেকে ভোলা জেলা বিএনপি সভাপতি আলহাজ গোলাম নবী আলমগীর আজ সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দেন। এছাড়াও যুবদল, ছাত্রদলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা আলাদাভাবে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। এ সময় ঘণ্টাব্যাপী সড়ক অবরোধ করে রাখেন বিএনপিকর্মীরা।
জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির সোপান সাংবাদিকদের জানান, ভোলা জেলা বিএনপির ডাকে আজ সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হবে। এছাড়াও সকাল থেকে কালো পতাকা উত্তোলন, দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা এবং বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করবেন।
নূরে আলমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ভোলা শহরজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শহরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তাদের সঙ্গে ছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও।
জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শহরের পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যেকোনো ধরনের নাশকতা রুখতে আগামীকাল (আজ) মাঠে থাকবে পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ড ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের একাধিক টিম। জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
নূরে আলমের মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় ভোলা জেলা বিএনপি সভাপতি গোলাম নবী আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশের গুলিতে এভাবে দুটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া মানা যায় না। সরকারকে এ হত্যাকান্ডের বিচার করতেই হবে।’
গত রবিবার ভোলা জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষের ঘটনায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আবদুর রহিম নিহত ও জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নূরে আলমসহ বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। পরে গতকাল নূরে আলম মারা যান। নিহত এই ছাত্রদল নেতা ভোলা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের চরনোয়াবাদ এলাকার সাবেক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সালেহর ছেলে। তার মৃত্যুর খবরে পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। এছাড়া তার মৃত্যুর খবরে জেলা ছাত্রদল ও তার সহকর্মীসহ ভোলার বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। দলীয় কার্যালয়ের সামনে এসে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলমত নির্বিশেষে অসংখ্য শোকবার্তা দেখা যায়। নূরে আলমের মৃত্যুর ঘটনায় বিএনপির তরফ থেকে মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানান সংগঠনটির নেতারা।
নূরে আলমের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে গণমাধ্যমে বাণী দিয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) একাংশের সভাপতি আবদুল করিম আব্বাসী ও সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন সেলিম।
উত্তাল নয়াপল্টন : নূরে আলমের মৃত্যুর সংবাদে ক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতাকর্মীরা নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে গতকাল বিক্ষোভ মিছিল করেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রকিবুল ইসলাম রাকিবসহ ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা সেøাগান দিতে থাকেন। সেøাগানে সেøাগানে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো নয়াপল্টন এলাকা। নব্বইয়ে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারবিরোধী আন্দোলনের জনপ্রিয় সেøাগান ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ আবার নতুন করে সরকারবিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর স্লোগানে ফিরে এসেছে। এছাড়া ‘নূর আলম ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’সহ বিভিন্ন সেøাগান দেন নেতাকর্মীরা। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগ দেন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন নেতাকর্মীদের নিয়ে কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নিহত নূরে আলমের জানাজা হবে বলে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। এদিকে রাত ৯টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় নিহত নূরে আলমের লাশের ময়নাতদন্ত করার জন্য।
সরকার দিশেহারা হয়ে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে-মির্জা ফখরুল : গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ভোটডাকাতির মাধ্যমে বর্তমান আওয়ামী সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে এক ভয়ংকর দুঃশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ করে এক নির্বাক রাষ্ট্র সমাজ গঠনের আয়োজন করেছে। জনগণের প্রতিবাদ-বিক্ষোভে দিশেহারা হয়ে মানুষ হত্যার মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার পুরো দেশে এক ভয়ের সংস্কৃতি চালু করেছে। এ হত্যার দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে সরকারকেই বহন করতে হবে।’