শেষবার ২০১৯ সালে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ফ্র্যাঞ্চাইজি বিক্রি করেছিল বিসিবি। ঐ বছরের শেষ দিকে গিয়ে ফের শুরু হয় টি-টোয়েন্টি সংস্করণের এই টুর্নামেন্ট। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত সেই টুর্নামেন্টের নাম হয় বঙ্গবন্ধু বিপিএল। তবে সেবার নিজেদের মালিকানায় দল পরিচালিত করেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। পৃষ্ঠপোষক দিয়ে পরের তিনটি আসর পরিচালিত হয়।
অবশেষে নিজেদের হাতে মালিকানা রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বিসিবি। ফের ফ্রাঞ্চাইজি বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে তারা। এজন্য গত ২ আগস্ট বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা। আগামী দুই মৌসুমের জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি বিক্রি করবে তারা। সেখানে আগ্রহ দেখিয়েছে রংপুর রাইডার্স ও সিলেট সানরাইজার্স।
বিপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি বিক্রির সিদ্ধান্ত থেকে বিসিবি সরে আসে ২০১৯ সালে। সে বছর বিপিএল আসর শেষে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসসহ কয়েকটি দল বিপিএলের লভ্যাংশ থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের মধ্যে ভাগ দেওয়ার দাবি জানান। তাছাড়া ঢাকা ডায়নামাইটস থেকে সাকিব আল হাসান রংপুর রাইডার্সে নাম লেখালে বেক্সিমকো মালিকানাধীন ঢাকা ও অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এরপর থেকে বিসিবি ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানা দেওয়া বন্ধ করে বিপিএলের সব দলের দায়িত্ব নিজেদের আয়ত্বে নেয়। যেগুলো স্পন্সরশিপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছিল।
২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া টুর্নামেন্টের নাম ছিল বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ। সাতটি দলের মধ্যে পাঁচটি স্পন্সর পেয়েছিল, বাকি দুটি বিসিবি পরিচালনা করছিল। যদিও ২০২১ সালে বিসিবি বিবিপিএলের ছয়টি দলের মালিকানা স্বত্ব বিক্রি করে দেয় মাত্র এক মৌসুমের জন্য। ক্রিকেট বোর্ড সভাপতি নাজমুল হোসেন বেশ কয়েকবার বলেছিলেন, দলগুলো যাতে ভালো পরিকল্পনা করতে পারে সেজন্য তারা আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য মালিকানা দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। প্রেসিডেন্টের কথার পর, বিসিবি ফের ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে আরও ভালোভাবে কাজ করার জন্য দীর্ঘ সময় দিয়েছে।
তবে পুরনো ফ্র্যাঞ্চাইজিদের অনেকে আবারও যোগদান করতে আগ্রহী হলেও কেউ কেউ আর আগ্রহী নয়। অনাগ্রহীরা বিপিএলে অংশ নেওয়াটা তাদের জন্য ফলপ্রসু মনে করেন না বলেই আর ফিরতে চাইছেন না।
দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট গ্রুপ বসুন্ধরার মালিকানাধীন ফ্র্যাঞ্চাইজি রংপুর রাইডার্সের এই টুর্নামেন্টে অনেক জনপ্রিয়তা। সাফল্যও পেয়েছে তারা। মাশরাফিকে দলে নেওয়ার প্রথম বছরেই তারা দলে নিয়েছিল ক্রিস গেইল, ব্রেন্ডন ম্যাককোলাম ও লাসিথ মালিঙ্গার মতো তারকাদের। ২০১৭ সালের সেই আসরে তারা বিপিএলের শিরোপাও জয় করেছিল। মাঝে দূরে সরে থাকলেও বিসিবির বিজ্ঞাপন দেখে বিপিএলে ফিরতে আগ্রহী তারা।
রংপুর রাইডার্সের হেড অব অপারেশন তাসভীর-উল-ইসলাম একটি ইংরেজি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা বিজ্ঞাপনটি দেখেছি। আশা করি, আমরা ফিরে আসব। আমাদের টপ ম্যানেজমেন্ট আবারও বিপিএলে অংশগ্রহণের ব্যাপারে খুবই ইতিবাচক। এখন আমরা কাগজপত্র জমা দেব। সবকিছু দেখে বিসিবি যদি আমাদের যোগ্য বলে মনে করে, আমরা আবার বিপিএলে অংশ নিতে চাই।’
নতুন চুক্তির মাধ্যমে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো তাদের শহরের নাম পরিবর্তন করতে পারবে, তবে তাসভীর বলেছেন, ‘আমরা রংপুরের সঙ্গেই থাকবে। কারণ অতীতে এই শহরের নাম নিয়ে আমরা সফল হয়েছি ‘
এদিকে বিপিএলের সবশেষ আসরে সিলেট সানরাইজার্সের মালিক গ্রগতি গ্রুপও আগ্রহ দেখিয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজি কেনার। তবে বসুন্ধরা শহরের নাম পরিবর্তন না করলেও তারা দল পেলে পদ্মা বিভাগের নাম নিতে চায়। এমনটি জানিয়েছেন প্রগতি গ্রীন অটো রাইস মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ ইবতিহাজ জয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা আগামী তিন বছরের জন্য বিপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক হতে খুব আগ্রহী। বিজ্ঞাপনটি সবেমাত্র এসেছে। আমাদের কাছে কাজ করার জন্য কিছু কাগজপত্র আছে। বিসিবি অনুমতি দিলে আমরা সিলেটের পরিবর্তে পদ্মা বিভাগের নাম নিতে চাই। যদি কোনো বিধিনিষেধ থাকে তবে সিলেটের সঙ্গে আমরা ঠিক আছি কারণ একটি সেখানে একটি স্টেডিয়াম রয়েছে। হোম ভেন্যু হিসেবে বাড়তি কিছু সুবিধা পেতে পারি। দর্শকদেরও উপচেপড়া একটা ভিড় থাকবে।’
এই দুই প্রতিষ্ঠান ফ্র্যাঞ্চাইজির কিনতে আগ্রহী হলেও মিনিস্টার গ্রুপ বিশেষ আগ্রহী নয়। প্রতিষ্ঠানটিন ২০২০ সালে ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিল। সেবার বিদেশীদের ছাড়াই বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ আয়োজিত হয়েছিল। সেই টুর্নামেন্টে প্রতিষ্ঠানটি রাজশাহীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ছিল। পরের বছর বঙ্গবন্ধু বিপিএলে ঢাকার প্রধান পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ছিল তারা। তবে এবার আর তাদের বিপিএলে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছে নেই তাদের।
জানতে চাইলে মিনিস্টার গ্রুপের ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন্স বিভাগের প্রধান সোহেল কিবরিয়া বলেন, ‘বিপিএলে দল চালানো খুবই ব্যয়বহুল। কোটি টাকা লাগে। এই মুহুর্তে, আমাদের কাছে বিপিএল দল চালানোর অবস্থা নেই। তবে পরিস্থিতি বিবেচনা করে শীর্ষ ম্যানেজমেন্ট শেষ মুহুর্তে তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে।’
এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের ঢাকা দলে তামিম ইকবাল, মাশরাফি বিন মুর্তজা ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের মতো খেলোয়াড়দের ভিড়িয়েছিল। তবে তাদের নামের যথার্থতা সেবার প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনজনেই। সোহেলের কণ্ঠেও ফুটে উঠল সেটা,‘আমরা ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্দেশ্যে ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। বিপিএল আমাদের কিছু মাইলেজ দিয়েছে, কিন্তু খরচ অনেক বেশি।’
মিনিস্টারের মতো ফরচুন বরিশালও আগ্রহী নয়। গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেছেন, ‘শুধুমাত্র যে কোম্পানিগুলো লাভ করতে পারে বা প্রচুর অর্থ খরচের সামর্থ আছে তারাই বিপিএলে দল বাছাই করতে পারে। আমাদের জন্য বিপিএলে অংশ নেওয়াটা ব্যবসায়িক দিক দিয়ে খুব একটা কার্যকর নয়। কারণ বিসিবি অংশগ্রহণকারী দলগুলির সঙ্গে কোনো লভ্যাংশ ভাগ করে না। তাহলে কেন একটি কোম্পানি বিনিয়োগ করবে? শিরোপা লড়াই করতে পারে এমন দল চালাতে ২০-২৫ কোটি টাকা লাগে। আমরা এই মুহুর্তে তাই বিশেষ আগ্রহী নই। তবে আমাদের শর্তাবলী মিলে গেলে আমরা পুনর্বিবেচনা করতে পারি।’
আসন্ন তিন মৌসুমের জন্য সাতটি দলের ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানা দেবে বিসিবি। এক্সপ্রেসন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) জমা দেওয়ার শেষ তারিখ আগামী ৩০ আগস্ট। তামাক, অ্যালকোহল (সারোগেটেড ও নন-সারোগেটেড), বেটিং এবং অনলাইন বেটিং সম্পর্কিত কোম্পানিগুলি যোগ্য নয়।