ভোলায় হরতাল, আরও ৭ দিনের কর্মসূচি

ভোলায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের সময় গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নূরে আলমের জানাজা গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জানাজার আগে দেওয়া সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নূরে আলমের মৃত্যুর প্রতিবাদে সাত দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে গণআন্দোলন শুরু করে নূরে আলম এবং রহিমের (ভোলার সংঘর্ষে নিহত) হত্যার প্রতিশোধ নেব।’

দেশজুড়ে লোডশেডিং ও জ্বালানি খাতে ‘অব্যবস্থাপনা’র প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত রবিবার ভোলায় বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা হলে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আবদুর রহিম ও গুরুতর আহত হন নূরে আলম। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনা হলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার মারা যান তিনি।

এদিকে জেলা বিএনপির ডাকা হরতালে ভোলায় গতকাল সকাল থেকে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। সকাল ৮টার দিকে হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল করেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। সকাল থেকেই রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করলেও অন্যান্য যানবাহন বন্ধ ছিল। তবে সকাল থেকে ভোলা-চরফ্যাশন সড়কে বাস চলাচল স্বাভাবিক দেখা যায়। হরতালকে কেন্দ্র করে ভোলা শহরজুড়ে পুলিশ, র‌্যাব ও কোস্টগার্ডের বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়। হরতাল চলাকালে সড়কে পিকেটিং লক্ষ করা যায়নি, তবে জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে অল্পসংখ্যক নেতাকর্মীদের অবস্থান ছিল।

নূরে আলমের জানাজায় অংশ নিতে গতকাল সকাল ১০টা থেকে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন। বেলা ১১টায় জানাজা হওয়ার কথা থাকলেও ময়নাতদন্ত শেষে দুপুর ১টার দিকে নয়াপল্টনে আনা হয় নূরে আলমের লাশ। জানাজায় বিএনপির কয়েক হাজার নেতাকর্মী অংশ নেন। নেতাকর্মীরা আসার আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য নয়াপল্টন ও এর আশপাশের সড়কে এবং অলিগলিতে অবস্থান নেন।

জানাজায় অংশ নিতে আসা বিএনপির নেতাকর্মীরা সড়কে অবস্থান নিলে ফকিরাপুল থেকে কাকরাইল মোড় পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আশপাশ এলাকাগুলোতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। জানাজা শেষে নূরে আলমের লাশ ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে ভোলার উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। দুপুর দেড়টার দিকে বিএনপির নেতাকর্মীরা সড়ক থেকে চলে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

মির্জা ফখরুল জানান, নূরে আলম ‘হত্যা’র প্রতিবাদে ৫ থেকে ৭ আগস্ট সারা দেশে শোক পালন করা হবে। ৬ থেকে ৮ আগস্ট তিন দিন ঢাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি হবে। ৬ আগস্ট ছাত্রদল, ৭ আগস্ট কৃষক দল এবং ৮ আগস্ট যুবদল ঢাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘পিতার কাঁধে পুত্রের লাশের চেয়ে বড় যন্ত্রণা, কষ্টের আর কিছু নেই। আমাদের ছেলে নূরে আলম ভোলা জেলা ছাত্রদলের সভাপতি। তাকে গুলি করে হত্যা করেছে এই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পুলিশ বাহিনী। গুলি করে হত্যা করেছে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আবদুর রহিমকে। আরও ১৯ জন ঢাকা-বরিশালের হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।’

আওয়ামী লীগ একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে গত ১৫ বছরে হত্যা-গুমের পথ বেছে নিয়েছে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আজ নতুন নয়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর একদলীয় শাসন পোক্ত করার জন্য ১৫ বছর ধরে ৬০০ নেতাকর্মীকে গুম করেছে। ৩৫ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। এখন আর ক্রন্দন নয়, আমাদের জেগে উঠতে হবে। এই ভয়াবহ কর্র্তৃত্ববাদী জুলুম নির্যাতনকারী সরকারের হাত থেকে এ জাতিকে মুক্ত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। শান্তিপূর্ণভাবে গণআন্দোলন শুরু করে নূরে আলম এবং রহিমের হত্যার প্রতিশোধ নেব।’ নেতাকর্মীদের ধৈর্যধারণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটিয়ে এ হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে।’

জানাজা পরিচালনা করেন ওলামা দলের সভাপতি মাওলানা নেছারুল হক। জানাজায় মির্জা ফখরুল ছাড়াও অংশ নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমানউল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ।

বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, এনপিপির ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জাগপার খন্দকার লুৎফর রহমান, এলডিপির ড. রেদোয়ান আহমেদ, ন্যাপ ভাসানীর অ্যাডভোকেট আজহারুল ইসলাম, এলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম, জাতীয় দলের সৈয়দ এহসানুল হুদা, এনডিপির আবু তাহের প্রমুখ জানাজায় অংশ নেন।

পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নিহত রহিমের স্ত্রী খাদিজার : গতকাল দুপুরে নিহত আবদুর রহিমের স্ত্রী খাদিজা বেগম ভোলা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আরমানসহ ৩৬ জনকে আসামি করে জুডিশিয়াল তদন্তের দাবি জানিয়ে আদালতে মামলা করেন। পরে তার অভিযোগ আমলে নিয়ে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ভোলা সদর মডেল থানার ওসিকে আগামী ৮ তারিখের মধ্যে এ মামলার সব নথিপত্র আদালতে উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আলী হায়দার কামাল এ নির্দেশ দেন।

অর্ধদিবসেই হরতাল প্রত্যাহার : দুপুর ১২টার দিকে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদলের সংবাদ সম্মেলনে জনদুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে হরতাল প্রত্যাহারের ঘোষণা করেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। এ সময় তিনি বলেন, ‘পুলিশের হামলায় নিহত ও আহত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ সরকারকে দিতে হবে। সরকারের নির্দেশে যদি পুলিশ গুলি না চালায়, তাহলে সরকারের উচিত হবে তাদের শাস্তির আওতায় আনা।’

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভাইস প্রেসিডেন্ট মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, শামসুজ্জামান দুদু, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন স্বপন, ভোলা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহীম, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। সংবাদ সম্মেলন শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে নিহত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আবদুর রহিমের স্ত্রীর হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেন কেন্দ্রীয় নেতারা।

ভোলা জেলা বিএনপির সকাল-সন্ধ্যা ডাকা হরতাল দুপুর ১২টায় প্রত্যাহারের ঘোষণার পর থেকেই শহরের দোকানপাট খুলতে শুরু করেন ব্যবসায়ীরা।

নূরে আলমের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন : বুধবার রাতে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে বেসরকারি কমফোর্ট হাসপাতাল থেকে নূরে আলমের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে পাঠায় পুলিশ। এরপর মৃতদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন শাহবাগ থানার এসআই কামাল হোসেন। ময়নাতদন্ত শেষে নূরে আলমের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানান শাহবাগ থানার ওসি মওদুদ হাওলাদার।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু করে দুপুর ১২টার দিকে ঢামেক মর্গে ময়নাতদন্ত শেষ করেন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. কাজী গোলাম মোকলেসুর রহমান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘মৃতদেহে কিছু স্পিলিট ইনজুরি ছিল। পোস্টমর্টেমের অন্যান্য ফাইন্ডিংস পর্যালোচনা করে রিপোর্টে আমরা আমাদের মতামত উল্লেখ করে দেব। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আমরা মরদেহ থেকে টিস্যু রেখেছি। এ রিপোর্টগুলো পাওয়ার পর আমরা পূর্ণাঙ্গ একটি রিপোর্ট দিতে পারব।’ এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন।

নিহত নূরে আলমের বড় ভাই আবুল কাশেম সাংবাদিকদের জানান, তাদের বাবা-মা দুজনই মারা গেছেন। স্ত্রী সিফাত ও একমাত্র মেয়ে আফরাসহ নূরে আলমের পরিবারের সবাই গ্রামের বাড়ি ভোলা সদরের চরনোয়াবাদ গ্রামে থাকেন। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে নূরে আলম ছিলেন সবার ছোট।