এই মুহূর্তে ডলার সংকটে অর্থনীতিতে হাঁসফাঁস অবস্থা। এতে স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত, নানামুখী সংকটে আবার ফিরে এসেছে সেই পুরনো দিনের লোডশেডিং। কথায় আছে, ‘আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খবর নিয়ে লাভ কী?’ মুশকিল হলো ডলার সংকটে ‘আদার ব্যাপারীরা’ বিপর্যস্ত হলেও, ‘জাহাজীদের’ ওপর এর প্রভাব সামান্যই। বরঞ্চ জাহাজীদের মর্জির ওপরই আদার ব্যাপারীরা অনেক বেশি নির্ভরশীল। অবস্থাটা এমনই যে ডলার নিয়ে যাদের কারবার নেই তারাই এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। আর ডলার নিয়ে যাদের নিত্যদিনের কারবার তারা অনেকটাই যেন দুশ্চিন্তার বাইরে। তারা তো আর নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থায় নেই। এটাই বাস্তব দুনিয়া! এই দুনিয়ার সামনে থেকে যতটা দেখা যায়, অন্তরালে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি কথা থেকে যায়। সেগুলোই অনেক সময় আসল কথা, বাকিগুলো মেকি। ডলার এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মুদ্রা। বিশ্বের বেশিরভাগ ব্যবসা-বাণিজ্য হয় ডলারে। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে ডলার বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী জায়গা তৈরি করেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের ক্ষমতার মঞ্চে পশ্চিমাদের নেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের যে আবির্ভাব তা ডলারকে এই শক্তিশালী অবস্থান ও ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।
আমাদের দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ডলার নির্ভর। এখন পর্যন্ত আমাদের বিদেশ থেকে যা প্রয়োজন তা আমরা ডলারের মাধ্যমেই আমদানি করে থাকি। এই আমদানি পণ্যের মধ্যে যেমন অতি প্রয়োজনীয় উপকরণ রয়েছে তেমন রয়েছে এমন কিছু দ্রব্য ও সেবা যেটা আমাদের জীবনে অতি প্রয়োজনীয় না হলেও ভদ্রস্থ জীবনযাপনে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা দুটোই রয়েছে। বলা হচ্ছে এবারের ডলার সংকটের পেছনে বিশ্বে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া দায়ী। করোনাকালের শুরুতেও ডলার সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বলা হয়েছিল যেহেতু রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাবে তার প্রভাব পড়বে ডলারের প্রয়োজনীয় সরবরাহে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল করোনাকালীন রিজার্ভ ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগল। কেউ কেউ বলে থাকেন প্রবাসীকর্মীরা তাদের সর্বশেষ সঞ্চয় দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার কারণে রেমিট্যান্স বেড়েছে। তবে অনেকেই বলেন এর মূলে রয়েছে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো বন্ধ হওয়া। আর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ যেহেতু বন্ধ ছিল তাই দেশ থেকেও মুদ্রা পাচারের সুযোগ সে সময় খুব একটা ছিল না।
বাংলাদেশের ডলার উপার্জনের প্রধান দুটি খাতের একটি হচ্ছে রেমিট্যান্স এবং অন্যটি তৈরি পোশাক শিল্প। আর এই দুটো খাতই নিম্ন আয় ও স্বল্পদক্ষ জনগোষ্ঠীর অবদানে সমৃদ্ধ। এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট-এর এক গবেষণা অনুযায়ী পোশাক খাতে বাংলাদেশে প্রায় ৪.২২ মিলিয়ন শ্রমিক কাজ করে। এর মধ্যে ১.৭১ মিলিয়ন পুরুষ এবং ২.৫০ মিলিয়ন নারী। এই খাত থেকে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশ বা আরও বেশি অর্জিত হয়। অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড মাইগ্রেশন রিপোর্ট ২০২২ অনুযায়ী বিশ্বে শ্রমিক পাঠানোতে সংখ্যার বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ এবং রেমিট্যান্স উপার্জনের ক্ষেত্রে ৮ম। এই রিপোর্ট অনুযায়ী ৭.৪০ মিলিয়ন বাংলাদেশি অভিবাসী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করে। অভিবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগই অদক্ষ ও অর্ধদক্ষ, যারা মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মানবেতর জীবনযাপন করে ডলার উপর্জন করে। এদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফলে করোনা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ২০২১-২২ অর্থবছরে ২১.৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স গ্রহণ করে। যদিও ২০২০-২১ অর্থবছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ২৪.৭৮ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্স গ্রহণ তিন বিলিয়ন ডলার কমলেও এর পেছনে কারণ বোঝা দুরূহ। হিসাব বলছে করোনাকালে পাঁচ লাখের মতো অভিবাসী শ্রমিক ফিরে আসতে বাধ্য হলেও, ২০২১ সালে ছয় লাখের বেশি নতুন বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং ২০২২ সালের প্রথম সাত মাসে এই সংখ্যা সাত লাখে পৌঁছে গিয়েছে। তাই অনেকেই বলে থাকেন রেমিট্যান্স কমার পেছনে রয়েছে হুন্ডির বাড়বাড়ন্ত এবং এর মাধ্যমে অর্থপাচার। ডলার উপার্জনের প্রধান এই দুটি খাতের পেছনে স্বল্প ও নিম্নআয়ের মানুষের হাড়ভাঙা পরিশ্রম থাকলেও তারা যেমন পাচারের বিদ্যাটা রপ্ত করতে পারেনি, একইভাবে যথেচ্ছাচার ডলার বা বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করাও তাদের কল্পনারও বাইরে।
অনেকেই বলে থাকেন আমাদের দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মূল বিষয় হচ্ছে বিভিন্ন উপায়ে অর্থপাচার, বিদেশি মুদ্রায় অবৈধ অর্থের মজুদ এবং ধনীদের জন্য বিলাসদ্রব্য আমদানিতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হচ্ছে আমদানি মূল্য বেশি দেখিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার পাচারে নাকি ব্যাংকেরও সহযোগিতা থাকতে পারে। সম্প্রতি ডলার সংকট যখন আলোচনায় এলো তখন জানা গেল এই ডলার সংকটের পেছনে দায়ী কিছু মানি এক্সচেঞ্জার। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় যারা করে থাকে তাদের বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লাইসেন্স গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে বৈধ মানি এক্সচেঞ্জারের তিনগুণ আছে অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জার। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জারগুলো কাদের প্রশ্রয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে এবং কাদের উদ্দেশ্য পূরণ করছে? অনেকেই বলে থাকেন এই অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জারদের সুবিধাভোগী অবৈধ উপার্জনকারীরা নিজেদের জমানো অর্থ নিজ দেশে রাখতে চান না এবং বলা বাহুল্য যে এরা ক্ষমতাবান। অনেকেই বলে থাকেন, এদের চাহিদা মেটাতে গিয়ে তরতরিয়ে ডলারের দাম বেড়ে চলেছে আর তার ফলেই মুদ্রাস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি। আর মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ। ভাবতে অবাক লাগে, যে নিম্ন আয়ের মানুষের হাড়ভাঙা খাটুনির ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তার সুফল সে ভোগ করতে পারে না, এর সুফল পায় তারাই যাদের হিসাব বহির্ভূত আয় আছে, যাদের বিদেশে ডলার পাঠানোর জায়গা আছে এবং যাদের বিদেশে ডলার খরচ করার সুযোগ আছে। এদের অনেকেই বিভিন্ন উপলক্ষে হরহামেশাই বিদেশে গিয়ে থাকেন, কখনো কেনা-কাটার জন্য, কখনো চিকিৎসার জন্য, কখনো আবার অবকাশ যাপনের জন্য, আবার কখনো-বা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য। একইভাবে আমরা যারা দেশ-বিদেশে আরাম-আয়েশের জন্য দেদার বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে থাকি তারাও বা এই শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর কষ্ট ও অবদান কতটুকু স্বীকার করে থাকি?
সে যাই হোক, ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকার ইতিমধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কিন্তু এত শত অব্যবস্থাপনার মধ্যে এই উদ্যোগ কতটুকু দীর্ঘস্থায়ী হবে তা বলা মুশকিল। পাত্রের আধার যতই বড় হোক না কেন, এতে ছিদ্রের সংখ্যা যদি বেশি থাকে তাহলে কোনো কিছু ধরে রাখা কঠিন। এখনকার ডলার সংকট যেন সেই কথাটাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। যার ফলাফল হলো আদার ব্যাপারীদের জাহাজের খবর রাখার দরকার না হলেও এখন জীবন ধারণের তাগিদে তাদেরও ডলারের খবরাখবর রাখতে হচ্ছে। এটাই বোধহয় এই সময়কার ট্র্যাজেডি।
লেখক : উন্নয়নকর্মী
psmiraz@yahoo.com