স্বাধীনতা, বাংলাভাগ আর শোকের আগস্ট

আগস্ট মাস, দুই বাংলার কাছেই অতীব ঘটনাবহুল। ওপারের মানুষজন নানাভাবে তাদের দুঃখ যন্ত্রণা তুলে ধরেন, পত্রপত্রিকা, টিভির আলোচনা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এ মাস তাদের শোকের। কে না জানেন ১৫ আগস্ট সপরিবারে খুন করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এখনো বাংলাদেশে গেলে প্রচুর মানুষ ছুটে যান ধানম-িতে। শেখ সাহেবের বাড়িতে। শোকবিহ্বল হয়ে স্মৃতিচারণ করেন, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ঘৃণায় ফেটে পড়েন সাধারণ মানুষ। কোনো কোনো শোকের তবুও ভাষা আছে প্রকাশের। এই যেমন শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকা-ের ঘটনা আপামর জনসাধারণকে এই আগস্ট মাস এলেই যন্ত্রণার গভীরে নিয়ে যায়।

আপাত দৃষ্টিতে আমার দেশে আগস্ট বিপ্লবের, স্বাধীনতার মাস। ১৯৪২-এ গান্ধীজি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে ডাক দিয়েছিলেন ‘ডু অর ডাই’, ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’। বলেছিলেন, ইংরেজ ভারত ছাড়ো। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় আগুন জ্বলে উঠেছিল। তবে তা অহিংস আন্দোলন ছিল না। সশস্ত্র পথে বিপ্লবীরা তিনদিন স্বাধীন করে রেখেছিল মেদিনীপুরকে। তারপরে মাত্র তিন বছরের মধ্যে উপমহাদেশ দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল। মধ্যরাতে, ১৫ আগস্ট ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু লালকেল্লায় পতাকা তুলে আবেগদীপ্ত ভাষণে এদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। আজ সেই স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর। ঢাকঢোল পিটিয়ে এই প্লাটিনাম জুবিলিকে ভারতের শাসকরা, অমৃত মহোৎসব বলে ঘোষণা করেছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় নরেন্দ্র মোদি ঘরে ঘরে তেরঙ্গা ঝান্ডা ওড়াতে জনগণকে ডাক দিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ছবিতেও অনেকেই তেরঙ্গা পতাকা আপলোড করছেন। কু লোকে অবশ্য ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন যে, ভারতে ক্ষমতায় এখন যে চরম দক্ষিণপন্থি দলটি, তাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি তো দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘আরএসএস’-এর এজেন্ডার ওপরে। কিন্তু ‘আরএসএস’ তো কোনো দিন এই স্বাধীনতা দিবস মেনেছে বলে মনে পড়ে না। তাদের পত্রপত্রিকায় যে উৎসব নির্দিষ্ট করা আছে তার প্রত্যেকটি হিন্দু ধর্মের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু কোথাও সেখানে ১৫ আগস্ট, স্বাধীনতা দিবসের উল্লেখ নেই। ১৫ আগস্ট ‘আরএসএস’ পালন করে জাতীয়তাবাদী নেতা ঋষি অরবিন্দের জন্মদিন হিসেবে। আপনি একটি ছবিও দেখাতে পারবেন না যেখানে সাভরকর বা অন্য কোনো নেতা তেরঙ্গা পতাকা নিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে মামিল হয়ে রাস্তায় নেমেছেন।

আর এখন তো ‘আরএসএস’ খোলাখুলিভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করতে চাইছে। তারা একদিকে অমৃত মহোৎসব করছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রকে, একুশ শতকে নিতে চলেছেন প্রাচীন এক পুরাকালের মুনি-ঋষিদের যুগে। এখানে দ্রুত ইতিহাসের যুক্তিতর্ক পেছনে সরিয়ে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে যাবতীয় গল্পগাথা। নতুন নতুন আবিষ্কার করে চমকে দিচ্ছেন নব্য হিন্দুত্ববাদীরা। বাবরি মসজিদ ভেঙে রামচন্দ্রের ‘জন্মস্থান’ তো আগেই হয়ে গেছে। এখন রোজ কখনো লালকেল্লা বা কখনো আবার তাজমহল কিংবা ফতেহপুর সিক্রির নিচে কোনো না কোনো মন্দির বা দেবতার স্থান আবিষ্কৃত হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে গৈরিকিকরণ চূড়ান্ত চেহারা নিচ্ছে। এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে জ্যোতিষ ও হিন্দু আচার শেখানো শুরু করছে। আজাদি কি অমৃত মহোৎসবে ভারতের অশোক স্তম্ভের সাবেক রূপ বদলে দেওয়া হয়েছে। সারনাথের শান্ত, সমাহিত সিংহকে আগ্রাসী, হিংস্র করা হয়েছে। যা কিছু মুসলিম আইডেন্টিটি তার ওপর আক্রমণ নামানো হচ্ছে অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ভাবে। কর্নাটকে পোশাক বিতর্ক থেকে শুরু করে কাশ্মীরের বিশেষ আইন বাতিল, সবক্ষেত্রেই ঘটনাচক্রে সংখ্যালঘুদের ওপর আঘাত আসছে।

বস্তুত শুধু মুসলিম কেন, খ্রিস্টানরাও ভারতে আজ নানাভাবে আক্রান্ত। দলিত, আদিবাসী কেউই আজ নিরাপদ নন। বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে বহুদিন ধরে। সামান্য কোনো প্রতিবাদ করাও ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। ওপর ওপর সব স্বাভাবিক। কিন্তু ভেতরে ভেতরে স্বৈরতান্ত্রিক চোরা স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে। নেহরুর ভারত ছিল, অনেক সমালোচনা সত্ত্বেও বহুত্ববাদী। মোটের ওপর অসাম্প্রদায়িক। যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামো স্বীকৃত ছিল মোটামুটিভাবে। সত্যি কথা বলতে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, গুলজারিলাল নন্দ, শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং বা রাজীব গান্ধী, অথবা নরসীমা রাও, এমনকি অটলবিহারি বাজপেয়ি অবধি সবাই কমবেশি সব ধর্মের প্রতি আজকের চেয়ে অনেক সহিষ্ণু ছিলেন। এখন যেমন পোশাক, খাবার সব কিছুতেই ধর্ম টেনে একধরনের অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে তা আগে কখনো এমন ভয়ংকর চেহারায় ভারত দেখেনি। পরিস্থিতি এখন এমন যে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী কালো পোশাক পরে বিক্ষোভ দেখালেও তাতে শাসক দলের হেভিওয়েট নেতারাও ধর্মীয় রং লাগিয়ে বিদ্রুপ করছেন। স্রেফ ধর্মের কারণে খুন, নিগ্রহ আজ নিত্যদিনের ঘটনা। আখলাক, কালবুর্গি, পানেসর, পহলু খান, তালিকা দীর্ঘ। আমি আপনি কেউই নিশ্চিত না যে আজ বা কাল আমাদের নাম সেখানে ঢুকবে কি না! পহলু খানের গ্রাম মেওয়াদে আমি গেছি। মেওয়াদ ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের গড়। কয়েকশো মানুষ শহীদ হয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়ে। গান্ধীজি বলতেন, আমাকে দশটা মেওয়াদ দিলে দেশ স্বাধীন করে দেব। ১৯৪৭-এ নেহরু যখন মাঝরাতে দেশের স্বাধীনতার পতাকা তুলছেন, মেওয়াদ তখন উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হামলার মুখে। আমরা কলকাতা, নোয়াখালী দাঙ্গা জানি। কিন্তু রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাব, আজকের হরিয়ানায় যে একটি সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চলেছিল, সেটা বলি না। সেই তো সবে শুরু, তারপর থেকে কখনো নেলি, ভাগলপুর, মুজাফফরপুর, দাঙ্গার কোনো বিরাম নেই। গুজরাট আলাদা করে বললাম না। এখন নানাভাবে তার গুরুত্ব লঘু করার যত চেষ্টাই হোক, শতাব্দীর লজ্জা তাতে আড়াল করা যায় না।

ছেচল্লিশ সালে ভয়াবহ ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নিয়ে শুধু মুসলিম লীগকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নিঃসন্দেহে সত্য নয়। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ১৯৩৭ থেকেই হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠনের মদদে ছোটখাটো দাঙ্গা চলছিলই। অবশ্যই তাতে মুসলিম লীগের ইন্ধন কিছু কম ছিল না। ছেচল্লিশ সালে আগুনে ঘি পড়লে যা হয়, তাই হয়েছিল দু’পক্ষের পারস্পরিক বিদ্বেষ নোংরা, ঘৃণ্য ভয়াবহ চেহারা নিয়ে আছড়ে পড়েছিল গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং নাম নিয়ে। একতরফা সোহরাওয়ার্দীকে দোষ দিয়েও লাভ নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে  আমরা মাথা ঘামাই না। তা হচ্ছে মুসলিম দাঙ্গাকারীদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল নিম্নবিত্ত বা গরিব। অথচ হিন্দুদের মধ্যবিত্ত অংশ এই দাঙ্গায় সরাসরি ভূমিকা নিয়েছিল। কমিউনিস্ট নেত্রী মণিকুন্তলা সেন লিখেছিলেন যে, অবাক হয়ে দেখছি যে হিন্দু মিডল ক্লাস ঘরের মেয়েরা ছাদ থেকে লাঠি নামিয়ে দিচ্ছে প্রতিপক্ষকে মারা হবে বলে। আর একটা বিষয় খুব বিসদৃশ লাগে, আমরা কলকাতা-নোয়াখালী বলি। প্রায় নীরব থাকি বিহারের দাঙ্গা নিয়ে। আমার ঢাকার অনেক প্রগতিশীল বন্ধুরাও সোহরাওয়ার্দীকে তুলোধুনো করেন কলকাতার দাঙ্গার খলনায়ক বলে। কিন্তু ভুলেও বিহারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিংহের নাম নেন না। অথচ বিহারে সবচেয়ে বেশিদিন ধরে দাঙ্গা চলেছিল। সোহরাওয়ার্দী কবে মিলিটারি ডেকেছিলেন তাই নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অথচ প্রায় একমাস বাদে নেহরুর ধমক খেয়ে শ্রীকৃষ্ণ সিংহ মিলিটারি ডাকতে বাধ্য হয়েছিলেন, তা নিয়ে একটি কথাও কেউ বলেন না। আমি এই দ্বিচারিতা নিয়েই আপত্তি করি।

ভারতের কথা যদি বাদ দিয়ে শুধু বাংলার কথা ধরি, তাহলে তো কোথাও কোনো সন্দেহ নেই যে মুসলিম লীগ একা বাংলাভাগের জন্য দায়ী নয়। যারা বাংলাভাগ চাওয়ার তারা চেয়েছিল, তা মূলত ‘আরএসএস’, ‘হিন্দু মহাসভা’। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর প্রিয় মেজদা শরৎচন্দ্র বসু, আবুল হাশিম, এমনকি খোদ সোহরাওয়ার্দী অবধি শেষমেশ চেষ্টা করেছিল স্বাধীন, সার্বভৌম অখণ্ড বাংলার জন্য। জিন্নাহ একসময় তা মেনেও নিয়েছিলেন। মানতে পারেননি তারা, যারা আজ এদেশের কুর্সিতে আসীন। বাংলাভাগ পশ্চিমবঙ্গের সর্বনাশ ডেকে এনেছে। ওপারে যেটুকু যা অর্জন, এপারের সংখ্যালঘু জীবনে তার ছিটেফোঁটাও নেই। ১৯৪৭-এ এপারের মুসলিম জীবনে অন্ধকার নিয়ে এসেছিল। বস্তুত শুধু মুসলিম নয়, বঙ্গ অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল। বিশদে বললে এপার বাংলা কেমন যেন দিল্লির উপনিবেশ হয়ে পড়তে থাকে দেশভাগের পর থেকে। রাজনৈতিকভাবে যতটা তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থনৈতিক দিক দিয়ে। স্বাধীনতার দু’বছর পরেই শরৎচন্দ্র বসু সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, আগামী দিনে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির ফলে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি কঠিন সংকটে পড়বে। বস্তুত মাশুল সমীকরণ ও অন্য বিবিধ বৈষম্যের কারণে তাই হয়েছিল, তা এখন সবাই জানেন। পাটশিল্প ক্রমেই ধ্বংস হতে লাগল। এর মূলেও ছিল বাংলা ভাগ। জুট কোম্পানি এ রাজ্যে অথচ পাটচাষ ওপারে বেশি। স্বাভাবিক কারণেই পরিস্থিতি খারাপ হতে লাগল। পাট উদাহরণ মাত্র।

নিশ্চিত স্বাধীনতা দিবস আমাদের গর্বের। আনন্দের তো বটেই। তবুও অস্বীকার করে লাভ নেই যে খন্ডিত বাংলা আজও একটু দুঃখ দেয় বৈকি!! 

লেখক ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

sdastidar27@gmail.com