বিশ্বের বড় বড় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি সিনেমা নির্মাণের জন্য যতটা যত্নশীল, তা প্রচার প্রচারণার জন্য ততটাই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। একটি সময় ঢালিউডেও সিনেমা হলে দর্শক ফেরাতে বর্ণাঢ্য প্রচারণার ব্যবস্থা করা হতো। কিন্তু নতুন দশকের প্রচারণার চিত্র চলচ্চিত্রপাড়া থেকে বলতে গেলে উধাও। প্রবাদ আছে প্রচারে প্রসার। কমপক্ষে গত দুই ঈদে ছবির নির্মাতা ও শিল্পীদের মধ্যে এই প্রবাদের যথার্থতা বুঝতে দেখা যাচ্ছে। সবাই ছুটে চলছেন এক সিনেমা হল থেকে অন্য সিনেমা হলে, এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। রাতদিন নির্ঘুম ব্যস্ত তারা ছবির প্রচারে। এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে যথেষ্ট।
গত ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া ‘পরাণ’ ছবিটি নিয়ে ৫ম সপ্তাহেও যথেষ্ট আগ্রহ দেখা যাচ্ছে দর্শকের মধ্যে। এর ঠিক এক সপ্তাহ পরে মুক্তি পাওয়া সিনেমাও চলছে তুমুল উদ্যমে। রাজধানী ঢাকার সিনেপ্লেক্সগুলোর সব শাখায় ইতিবাচক সাফল্য দেখাচ্ছে মেজবাউর রহমান সুমনের ‘হাওয়া’। এখনো হাউজফুল ব্যবসা করছে ছবিটি। এর মধ্যে খবর এলো, যশোরের ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহ মণিহারেও ছবিটি হাউজফুল হচ্ছে। গত শুক্রবার থেকে ছবিটি এই প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল ইসলাম জানালেন, প্রতিদিন চারটি করে শো হয়। এরমধ্যে শুক্রবার দুটি শো হাউজফুল হয়েছে। যা গেল পাঁচ বছরের মধ্যে আবারও দেখা গেল। মণিহার প্রেক্ষাগৃহে রয়েছে ১ হাজার ৪০০টি আসন। এরমধ্যে ওপরতলায় ৫৫১ আসন আর নিচে ৮৫০ আসন। প্রতিদিন স্পেশাল, ম্যাটিনি, ইভিনিং ও নাইট মিলিয়ে চারটি শো হয়। সব শোতে তো আর একই রকম দর্শক হয় না। তবে শনিবার কমেছে ৫০ ভাগ। আমাদের তো আসলে অনেক বড় হাউজ, সিনেপ্লেক্সগুলোতে তো দুই শ থেকে আড়াইশ কখনো তিনশ। তাই এ ধরনের ছবি দিয়ে সব আসন পূর্ণ করা সম্ভব নয়। তারপরও এমনটায় আমরা অনেক সন্তুষ্ট। মন্দার এ বাজারে প্রথম দিন আমরা দুই লাখ টাকার ওপরে টিকিট বিক্রি করেছি। পাঁচ বছর আগে আমাদের এ হলে শাকিব খানের সিনেমা ভালো ব্যবসা দিয়েছিল। “শিকারি” ছবিটি তখন টানা দুই সপ্তাহ চলেছিল। হাউজফুল ছিল।’
বিষয়টি নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত প্রথিতযশা চলচ্চিত্রকার কাজী হায়াৎ। তিনি বলেন, ‘চলচ্চিত্রের পালে নতুন হাওয়া লেগেছে। ঝিমিয়ে পড়া চলচ্চিত্র নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। এটাই এখন বাস্তবতা। কমপক্ষে গত দুই ঈদে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রের প্রতি দর্শক আগ্রহ এবং সিনেমা হলে দর্শকের জোয়ার দেখে আবার প্রমাণ হলো মানসম্মত ছবি পেলে দর্শক সিনেমা হলে আসবেই। দেশি ছবি দেখবেই। চলচ্চিত্রের এই বহমান প্রাণ ধরে রাখতে ভালো ছবি নির্মাণের বিকল্প নেই।’
গত কোরবানির ঈদে মুক্তি পেয়েছে তিনটি সিনেমা। সেগুলো হলোÑ বাংলাদেশ-ইরান যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত অনন্ত জলিল-বর্ষা জুটির সিনেমা ‘দিন : দ্য ডে’, রায়হান রাফি পরিচালিত শরিফুল রাজ, বিদ্যা সিনহা মিম ও ইয়াশ রোহান অভিনীত ‘পরাণ’ এবং অনন্য মামুন পরিচালিত রোশান-পূজা অভিনীত সিনেমা ‘সাইকো’। এই তিন সিনেমার মধ্যে ‘দিন : দ্য ডে’ ও ‘পরাণ’ দারুণভাবে সাড়া ফেলেছে এবং আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সিনেমা হলগুলোর সামনে দর্শকের ভিড় এবং রীতিমতো টিকিট নিয়ে কাড়াকাড়ির মতো ঘটনাও ঘটেছে। হাউজফুল গেছে শো। মুক্তির এতদিন পরও ঈদের সিনেমা দেখতে এখনো মানুষ প্রেক্ষাগৃহে যাচ্ছেন। করোনা মহামারীর পর বাংলা সিনেমার প্রতি দর্শকদের এমন আগ্রহ বেশ ইতিবাচক মনে করছেন সিনেমা-সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, নতুন করে যেন বইতে শুরু করেছে চলচ্চিত্রে সুবাতাস। এর পেছনে কারণও রয়েছে। ঢাকাই সিনেমায় আলোচিত জুটি অনন্ত জলিল-বর্ষা দীর্ঘ আট বছর পর পর্দায় ফিরেছেন। তাও আবার ১০০ কোটির সিনেমা দিয়ে। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এত বড় বাজেটের সিনেমা এর আগে মুক্তি পায়নি। যেটি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আর ‘দিন : দ্য ডে’র প্রচারণাও ছিল ব্যাপক। শহর, জেলা ও মফস্বলের দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসসহ হলে হলে সর্বত্রই পৌঁছানোর জন্য সবটুকু চেষ্টাই করেছেন অনন্ত জলিল। অন্যদিকে ‘পরাণ’ও দাপটের সঙ্গে চলেছে। বাজেট কম হলেও ‘দিন : দ্য ডে’র সঙ্গে বেশ ভালোই টক্কর দিয়েছে ‘পরাণ’। ‘দিন : দ্য ডে’ সিনেমায় বাজেট, লোকেশন, বিদেশি শিল্পী ও প্রযুক্তির ব্যবহার থাকলেও ‘পরাণ’ এগিয়ে ছিল গল্প, অভিনয় ও সুনির্মাণের কারণে। বিদ্যা সিনহা মিম এখানে নতুন করে নিজেকে চিনিয়েছেন। আর শরিফুল রাজ অনবদ্য অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করেছেন। নতুন এই নায়কে সবাই রীতিমতো বুঁদ হয়েছেন। অন্যদিকে ‘সাইকো’র পরিচালক অনন্য মামুন দাবি করেছেন ঢাকার বাইরে তাদের সিনেমাটি বেশ ভালো চলেছে। ‘পরাণ’ ছবিটি শুরুতে স্বল্পসংখ্যক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলেও দ্বিতীয় সপ্তাহে তার চার গুণ বেড়ে ৫৫ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। এবার এলো নতুন খবর। এ সিনেমা যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়া-কানাডাসহ আটটি দেশে মুক্তি পেতে যাচ্ছে।