করোনা শনাক্তের প্রথম কিট উদ্ভাবন করল বাংলাদেশ

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা করোনা পরীক্ষার কিট আবিষ্কার করলেন। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে এই কিট উদ্ভাবন করেছেন। ‘বিসিএসআইআর কভিড’ কিট নামে এই কিট আরটিপিসিআর পদ্ধতিতে কভিড-১৯ শনাক্তকরণের জন্য বর্তমানে বাংলাদেশে আমদানি করা কিটের চেয়ে সহজ, উন্নত ও দশ গুণ সাশ্রয়ী বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।

এমনকি বর্তমানে আরটিপিসিআর পদ্ধতিতে একটি নমুনা পরীক্ষায় যেখানে ব্যয় হয় সাড়ে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা; সেখানে বাংলাদেশের উদ্ভাবিত কিটে ব্যয় হবে মাত্র আড়াই শ টাকা। করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে ফলও পাওয়া যাবে বলে দাবি করেছে বিসিএসআইআর। 

গতকাল রবিবার রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব বিসিএসআইআর মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিসিএসআইআরের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আফতাব আলী শেখ বাংলাদেশের প্রথম কিট উদ্ভাবনের এ ঘোষণা দেন। 

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান বলেন, বিজ্ঞান গবেষণায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অকাতরে টাকা দেন। বিজ্ঞানীদের গবেষণায়ও প্রধানমন্ত্রী সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন এবং ল্যাব প্রতিষ্ঠা করছেন সর্বোচ্চ মানের।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরাও পারি, বাঙালি পারে। বাঙালির মেধা ভিন্ন দেশে আগে কাজ করত, এখন থেকে নিজ দেশেও বাঙালিরা অনুপ্রেরণা পাবে।’

এ ব্যাপারে বিসিএসআইআর চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আফতাব আলী শেখ বলেন, বিসিএসআইআর-কভিড কিট কভিড-১৯ শনাক্তকরণের জন্য একটি সহজ এবং সাশ্রয়ী পদ্ধতি। দেশের ঔষধশিল্পে জড়িত বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দ্রুত এই কিট উৎপাদনে গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশের জনগণ অত্যন্ত উপকৃত হবে। এ ক্ষেত্রে বিসিএসআইআরের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা সব সময় কারিগরি সহায়তা অব্যাহত রাখবেন।

কিটের বাজারজাতকরণ প্রসঙ্গে বিসিএসআইআরের কর্মকর্তারা জানান, বিসিএসআইআর কিটটি বাজারজাত করবে না। ওষুধ কোম্পানিগুলো চাইলে বিসিএসআইআর থেকে কিট নিয়ে উৎপাদন করবে। পরে তাদের থেকে সরকার কিনে নিয়ে ল্যাবগুলোতে সরবরাহ করবে।

সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রফিকুল হাসান ও বিসিএসআইআরের প্রধান বিজ্ঞানী সেলিম খান।

কিট প্রসঙ্গে বলা হয়, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও বিস্তার নিয়ন্ত্রণের জন্য করোনা দ্রুত ও নির্ভুল শনাক্তকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। করোনা মহামারী এখনো চলমান এবং বাংলাদেশে এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৬৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক শনাক্তকরণ কিট সম্পূর্ণটাই আমদানি করতে হয়, যা আমাদের দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছে। এ ছাড়া করোনাভাইরাস ঘন ঘন তার জিনগত পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, ফলে বাণিজ্যিক কিটগুলোর শনাক্তকরণ সেনসিটিভিটি ও স্পেসিফিসিটি কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুল ফলাফল (ফলস নেগেটিভ) দিতে পারে।

বিসিএসআইআরের বিজ্ঞানীরা আরও জানান, কভিড-১৯ শনাক্তকরণে আরটিপিসিআর টেস্টকে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ধরা হয়। দেশে বর্তমানে যে আরটিপিসিআর কিট ব্যবহৃত হচ্ছে তা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ, প্রতিটি পরীক্ষায় ব্যয় হয় আনুমানিক ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। ভাইরাস শনাক্তকরণের জন্য আরএনএ এক্সট্রাকশন একটি ব্যয়বহুল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মূলত এ কারণেই বাণিজ্যিক কিটগুলোর খরচ বৃদ্ধি পায়। বিসিএসআইআর অত্যন্ত স্বল্প ব্যয়ে আরএনএ এক্সট্রাকশনের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। তাই বিসিএসআইআর-কভিড কিট দ্বারা প্রতিটি শনাক্তকরণ পরীক্ষায় খরচ হবে মাত্র ২৫০ টাকা।

বিজ্ঞানীরা জানান, বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত কিটটি কভিড-১৯-এর শনাক্তকরণের জন্য একটি সহজ এবং সাশ্রয়ী পদ্ধতি। বিসিএসআইআর-কভিড কিট দ্বারা একেবারেই ন্যূনতমসংখ্যক ভাইরাসকেও শনাক্ত করা যাবে। ফলে রোগের উপসর্গ প্রকাশের আগেই ভাইরাসের উপস্থিতি জানা সম্ভব হবে।

নতুন উদ্ভাবিত কিট সম্পর্কে আরও বলা হয়, এই কিটে ফলস নেগেটিভ ফলাফলের আশঙ্কা কম এবং ফলাফল বিশ্লেষণ করা তুলনামূলক সহজ ও যথাযথ। এই কিটের জন্য টার্গেটকৃত প্রাইমার ও প্রোব বিসিএসআইআরের বিজ্ঞানীরা নিজস্ব গবেষণাগারে ডিজাইন করেছেন। তাই এই কিটটি অন্য বাণিজ্যিক কিটের তুলনায় স্বতন্ত্র।

বিজ্ঞানীরা জানান, তুলনামূলক পরীক্ষায় দেখা গেছে, বিসিএসআইআর-কভিড কিটের স্পেসিফিসিটি, সেনসিটিভিটি ও অ্যাকিউরেসি গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড কিটের সমকক্ষ ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কিট থেকে উন্নতমানের। তাই বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি) ইতিমধ্যে এই কিটকে এথিক্যাল ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে। সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরও অনুমোদন দিয়েছে।

উদ্ভাবিত কিটের বৈশিষ্ট্য : বিসিএসআই নতুন উদ্ভাবিত কিটের ছয়টি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছে। সেগুলো হলো ১. বিসিএসআইআর-কভিড কিটে সার্স-কভিড-২ ভাইরাসের ‘এম’ জিনকে টার্গেট করা হয়েছে। এই জিনের মিউটেশন তুলনামূলক কম এবং ওই জিনকে ব্যবহার করে কভিড ডিটেকশন কিট উদ্ভাবন বিশে^ এটিই প্রথম।

২. এই কিটের জন্য ‘এম’ জিনকে টার্গেট করে যে ‘প্রাইমার’ ও ‘প্রোব’ ব্যবহার করা হয়েছে তা বিসিএসআইআর বিজ্ঞানীরা নিজস্ব গবেষণাগারে ডিজাইন করেছেন, ফলে কিটটি বাজারে প্রচলিত কিটের চেয়ে আলাদা এবং স্বতন্ত্র।

৩. উদ্ভাবিত কিটের স্পেসিফিসিটি, সেনসিটিভিটি এবং অ্যাকিউরেসি গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের সমমান ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কিট থেকে উন্নতমানের।

৪. কিটটির লিমিট অব ডিটেকশন (এলওডি) ১০০ কপি ভাইরাস/মিলি; যা বাজারে প্রচলিত অন্যান্য কিটের চেয়ে অনেক কম। তাই কিটটি ইনফেকশনের শুরুতেই কভিড-১৯ শনাক্ত করতে সক্ষম।

৫. এ কিটটি করোনার সব ভ্যারিয়েন্ট (আলফা, গামা, অমিক্রন ইত্যাদি) শনাক্ত করতেও সক্ষম।

৬. আরএনএ এক্সট্রাকশনের ক্ষেত্রে গ্লাইকোজেন ব্যবহার করায় উদ্ভাবিত কিটটি স্বল্প খরচে কডিড-১৯ টেস্ট করতে সক্ষম।