সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজারে ডলার সংকটকে পুঁজি করে অনেক ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ডলার ধরে রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে দাম বাড়ানোর এ অভিযোগ খতিয়ে দেখতে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলো পরিদর্শন শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত ডলার ধরে রেখে দর বাড়ানোর প্রমাণ পাওয়ায় দেশি-বিদেশি ছয় ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানদের সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। অনেক ব্যাংকেই ট্রেজারি প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন উপব্যবস্থাপনা পরিচালকরা।
গতকাল সোমবার অভিযুক্ত ব্যাংকগুলোকে তাদের ট্রেজারি প্রধানদের অপসারণের নির্দেশ দিয়ে চিঠি দেওয়া হয় বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিদর্শন বিভাগের উদ্যোগে পরিচালিত পরিদর্শনে ডলার কেনাবেচায় একটি বহুজাতিক ব্যাংক ও পাঁচটি স্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকের অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রমাণ পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়ে ট্রেজারি বিভাগসহ এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
ডলার বেচাকেনার দর নির্ধারণের বিষয়টি পরিচালিত হয় ট্রেজারি বিভাগের তত্ত্বাবধানে। এ ক্ষেত্রে ট্রেজারি বিভাগের প্রধানের কথা উল্লেখ না থাকলেও দায়ী সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান সিরাজুল ইসলাম।
জানা গেছে, বিদেশি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, দেশি ব্র্যাক ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংকসহ ছয়টি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
করোনা মহামারীর সংকট কেটে যেতে শুরু করলে গত বছরের শেষ দিক থেকে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে শুরু করে। এর মধ্যে চলতি বছরের মার্চে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। রাশিয়ার সঙ্গে ডলারে লেনদেনে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সূত্র ধরে ডলারের সরবরাহ নিয়ে চিন্তায় পড়ে অনেক দেশ। এ ছাড়া জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্য সরবরাহকারী দুই শীর্ষ দেশ রাশিয়া-ইউক্রেনের বৈদেশিক বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। ফলে প্রতিটি দেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। দেখা দেয় ডলার সংকট। বাংলাদেশ, ভারতসহ অনেক দেশেরই স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটে। রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ বাড়াতে হয় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।
এই পরিস্থিতিতে গত ২৬ জুলাই দেশের খোলাবাজারে (কার্ব-মার্কেট) ডলারের দর বেড়ে ১১২ টাকায় উঠলে ডলারের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। দেশের ব্যাংকগুলোতে তখন নগদ ডলার ১০৮ টাকায় উঠে যায়। অথচ গত মে মাসেই ডলারের দর ছিল ১০০ টাকার নিচে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ডলারের দর প্রায় ৬-৭ টাকা বেড়ে যায়।
এর পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানে অভিযান শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। অভিযানে ৮০টির মতো প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন করে বেশি দামে ডলার বিক্রিসহ বিভিন্ন অনিয়মের জন্য ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়।
এরপর গত ১০-১২ দিন ডলারের বাজার কিছুটা স্থির থাকলেও গতকাল আবারও ডলারের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। খোলাবাজারে ডলার বিক্রি হয় ১১৫ টাকায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আন্তঃব্যাংক ডলারের দর ৩০ পয়সা বাড়িয়ে ৯৫ টাকা নির্ধারণ করে। এর সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ডলারের দরও কিছুটা বাড়িয়ে দেয়।
ডলার থেকে আয় কয়েকগুণ : সাম্প্রতিক সময়ে যে ডলার সংকট তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ নিয়ে নিজেদের মুনাফা বাড়িয়ে নিয়েছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোর অর্ধবার্ষিকের (জানুয়ারি-জুন) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ সময়ে ডলার ব্যবসা থেকে ব্যাংকগুলোর আয় কয়েকগুণ বেড়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি হিসাববছরের প্রথমার্ধে ডলার ব্যবসা থেকে সবচেয়ে বেশি আয় করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এ সময়ে ব্যাংকটি ডলার ব্যবসা থেকে ৫১২ কোটি ৭২ লাখ টাকা আয় করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৬৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। অন্যান্য ব্যাংকের মতো এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ডলার ব্যবসা থেকে সবচেয়ে বেশি আয় করেছে ব্যাংকটি। এ সময়ে এ খাত থেকে ব্যাংকটির আয় হয়েছে ২৯৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৬৩ কোটি টাকা।
সিটি ব্যাংক চলতি বছরের প্রথমার্ধে ডলার ব্যবসা থেকে আয় করেছে ৩৮৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৬০ কোটি টাকা। চলতি এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ডলার ব্যবসা থেকে ব্যাংকটির আয় হয় ২০৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৩৯ কোটি টাকা।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ডলার ব্যবসা থেকে প্রাইম ব্যাংকের আয় বেড়েছে ১৩৫ শতাংশ। এ সময় এ খাত থেকে ব্যাংকটির আয় হয়েছে ২২৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৯৬ কোটি টাকা। তবে এ আয়ের বড় অংশই এসেছে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে। এ সময়ে ডলার ব্যবসা থেকে আয় হয় ১৩৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫০ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) ডলারের কমিশন ও বিনিময় ব্যবসায় ঢাকা ব্যাংকের আয় বেড়েছে ৯২ শতাংশ। এ সময় এ খাত থেকে ব্যাংকটির আয়ের পরিমাণ ১৬৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৮৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ডলার ব্যবসা থেকে ঢাকা ব্যাংকের আয় হয়েছে ২৬২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৫১ কোটি টাকা।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিদেশি মুদ্রার কমিশন, বিনিময় ও ব্রোকারেজ থেকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৪৯২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩০০ কোটি টাকা। চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে ডলার থেকে ব্যাংকটির আয় হয় ২৪১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৫৬ কোটি টাকা।
প্রিমিয়ার ব্যাংক চলতি প্রথমার্ধে ডলার থেকে আয় হয়েছে ৩৯৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৭৩ কোটি টাকা। এ খাতের আয়ের বড় অংশই এসেছে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে, ২৪৭ কোটি ৮৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১০১ কোটি টাকা।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে এপ্রিল থেকেই বাজারে ডলার সংকট দেখা দেয়। ব্যাংকগুলোও এর সুযোগ নিতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া হারের চেয়ে অনেক বেশি দরে আমদানিকারকদের কাছে ডলার বিক্রি করে ব্যাংকগুলো।
বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এবি ব্যাংক ডলার ব্যবসা থেকে আয় করেছে ৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। একই সময়ে এ খাত থেকে ব্যাংক এশিয়ার আয় হয় ২৩৪ কোটি টাকা। আগের বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এ ব্যবসা থেকে ব্যাংকটির আয় ছিল ৭৭ কোটি টাকা। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ডলার ব্যবসা থেকে ১১২ কোটি ৫১ লাখ টাকা আয় করেছে দ্বিতীয় প্রান্তিকে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩৮ শতাংশ বেশি।
দ্বিতীয় প্রান্তিকে ডলারে যমুনা ব্যাংকের আয় হয় ১২৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৬ কোটি টাকা। এ সময়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের আয় হয় ১৬৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬৮ কোটি টাকা। একই প্রান্তিকে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ডলারে আয় করেছে ২০৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৭৫ শতাংশ বেশি। এ সময়ে পূবালী ব্যাংকের আয় বেড়েছে ১৭৪ শতাংশ। শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ১২৯ কোটি টাকা, ট্রাস্ট ১১২ কোটি ও উত্তরা ব্যাংক ৬৪ কোটি আয় করেছে। তবে ডলার থেকে প্রায় সব ব্যাংকের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও রূপালী ব্যাংকের আয় উল্টো কমেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এ ব্যবসা থেকে ব্যাংকটির আয় হয় ৩৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথমার্ধেও ব্যাংকটির আয় আগের বছরের তুলনায় ৩৪ কোটি টাকা কমেছে।