আইএমএফ প্রতিনিধি দল আসছে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে

ঋণ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে আগামী মাস সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় আসছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিনিধিদল। চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে আইএমএফের কাছে ঋণের আবেদন করেছে বাংলাদেশ। ঋণ পেতে আইএমএফের প্রতিনিধিদলকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বহুজাতিক এ ঋণদাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঋণের পরিমাণ ও শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছে অর্থ বিভাগ।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে ঋণের পরিমাণ ৪৫০ কোটি ডলার বলা হলেও অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, আইএমএফকে পাঠানো আবেদনে ঋণের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা আইএমএফ প্রতিনিধিদলের ঢাকায় আসার বিষয়টি গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, গত ২৪ জুলাই ঋণের জন্য আইএমএফকে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বাংলাদেশের ঋণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বিস্তারিত বলা হয়েছে। বাংলাদেশের আবেদন পাওয়ার পরে ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি প্রকাশ করেছে আইএমএফ। ঋণ দেওয়ার আগে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রী ও বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে আইএমএফ প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব কে দেবেন, কতজন সদস্য থাকবেন আইএমএফ এখনো অর্থ বিভাগকে তা জানায়নি বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফের কাছ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পেতে সরকারকে বেশ কিছু শর্ত মানতে হবে। সংস্থার প্রতিনিধিদলটি আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় এলে শর্তগুলো জেনে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে প্রাথমিক আলোচনায় আইএমএফ বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ সার্বিক বাজেট ভর্তুকি ও খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার কথা বলেছে। আর্থিক খাতের সংস্কার, ব্যাংকের ৬-৯ সুদহার পুনর্নির্ধারণ, কর কাঠামোর পুনর্বিন্যাস, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অতিমূল্যায়ন বন্ধ করার কথাও বলেছে তারা। এছাড়াও মেগা প্রকল্পসহ সব ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর তারা জোর দিয়েছে। এছাড়া আইএমএফ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে (ডলার) কোনোরকম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যাবে না বলেও জানিয়েছে। তবে এগুলো চূড়ান্ত নয়। শর্ত আরও বাড়তে পারে।

অর্থ বিভাগ সূত্র আরও জানায়, ঋণ পেতে সব দেশকেই আইএমএফের কোনো না কোনো শর্ত মানতে হয়। শুধু বাংলাদেশ নয়, গত ১২ থেকে ২১ জুলাই আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল নিয়মিত সফরের অংশ হিসেবে ঢাকায় অবস্থান করে। তখন দলটির সঙ্গে ৪৫০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়। এরপরই বাংলাদেশ ঋণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়।

আইএমএফকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, কভিডের প্রভাব মোকাবিলায় ঠিক সময়ে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রণয়ন করে সেগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষের কভিড আক্রান্ত কম হওয়া, মৃত্যুর হার কম থাকা এবং টিকা দেওয়ার উচ্চহারের কারণে ২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকেই অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর কারণে রপ্তানি খাত প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং কৃষি, উৎপাদনশীল খাত ও সেবা খাত কার্যকরভাবেই ফিরে এসেছে। তবে এখন ক্রিটিক্যাল টাইম বলে জরুরি ভিত্তিতে লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখা ও বাজেট সহায়তা বাবদ বাংলাদেশের অর্থের দরকার।

চিঠিতে বলা হয়, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন দেশের অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসায় বিশ্ববাজারে অভূতপূর্ব হারে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ¦ালানি তেল, গ্যাস, সার ও ভোজ্য তেলের দাম এখনো অস্থির। ফলে শুধু নয়টি পণ্যেই অর্থাৎ পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা, চাল, গম, ভুট্টা, সার, পাম তেল ও সয়াবিন তেল আমদানিতে বাড়তি গুনতে হয়েছে ৭৬০ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৯৪ দশমিক ৭০ টাকা দরে হিসাব করলে বাংলাদেশি মুদ্রায় তা দাঁড়ায় ৭১ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা।