টাঙ্গাইলে বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণ

শ্লীলতাহানির শিকার একাধিক নারী যাত্রী

টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলন্ত বাসে ডাকাতির সময় এক নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ছাড়াও একাধিক নারীর শ্লীলতাহানি করেছে ডাকাতরা। ডাকাত দলটি পেশাদার। তাদের মধ্যে অন্তত সাতজন বিভিন্ন পোশাক কারখানার কর্মী। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঠা-া মাথায় তারা ডাকাতি করে। এই ডাকাত দলের হোতা মো. রতন হোসেনের বিরুদ্ধে ডাকাতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে আগেও মামলা হয়েছে। জামিনে থাকা অবস্থায় গত ৬ মাসে তার নেতৃত্বে অন্তত ১০টি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। রতনসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করার পর র‌্যাব এসব তথ্য জানিয়েছে। ডাকাতিতে অংশ নেওয়া ১৩ জনের সবাই ধরা পড়েছে।

গত রবিবার র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা, র‌্যাব-১২ ও র‌্যাব-১৪ ঢাকা, গাজীপুর ও সিরাজগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে  ডাকাত দলের প্রধান রতন ও অন্য ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে। বাকিরা হলোÑ মো. আলাউদ্দিন, মো. সোহাগ ম-ল, খন্দকার মো. হাসমত আলী ওরফে দীপু, মো. বাবু হোসেন ওরফে জুলহাস, মো. জীবন, আবদুল মান্নান, মো. নাঈম সরকার, রাসেল তালুকদার ও মো. আসলাম তালুকদার ওরফে রায়হান। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ২০টি মোবাইল ফোনসেট, ২টি রুপার চুড়ি, ১৪টি সিম কার্ড ও ডাকাতিতে ব্যবহৃত একটি দেশীয় অস্ত্র (ক্ষুর)।

গত ২ আগস্ট রাতে কুষ্টিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জগামী ঈগল এক্সপ্রেস নামে একটি পরিবহনের বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।

গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানান র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে রতন মিয়া বাস ডাকাতির তিন দিন আগে তার সহযোগী রাজা মিয়াকে প্রস্তাব দেয়। পরে রাজা মিয়া রতন ও দলের অন্য সদস্য মান্নান, জীবন, দীপু, আউয়াল ও নুরনবীকে ডাকাতির পরিকল্পনার কথা জানায়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় মান্নান ও তার সহযোগী সোহাগ, আসলাম, রাসেল, নাঈম ও আলাউদ্দিন। রতনের নেতৃত্বে ১৩ জন বাসে লুটপাটে অংশ নেয়।

র‌্যাবের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, গত ২ আগস্ট দুপুরে গাজীপুরের জিরানী বাজার এলাকায় সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী বাসে ডাকাতির পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। রতন যাবতীয় প্রস্তুতির আর্থিক খরচ বহন করে। চক্রের সদস্যদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে প্রত্যেকের কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রতন ২ আগস্ট রাতেই টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা মোড়ের একটি দোকান থেকে চারটি চাকু, দুটি কাঁচি ও একটি ক্ষুর সংগ্রহ করে।

ডাকাতির ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ওই রাতেই রাজাসহ চক্রের অন্য সদস্যরা সিরাজগঞ্জ রোড মোড় এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে থাকে। রাত আনুমানিক ১টার দিকে ঈগল পরিবহনের বাসটি সেখানে পৌঁছলে রাজা থামার সংকেত দেয় এবং যাত্রীবেশে রতন, রাজা, মান্নান ও নুরনবী বাসে ওঠে। পরে আরও দুই জায়গা থেকে যাত্রীবেশে তাদের সহযোগীরা বাসে ওঠে। ওই বাসে ২৪ জন যাত্রী থাকায় ডাকাত চক্রের অধিকাংশ সদস্য বাসের পেছনের দিকে বসে। বাসটি বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু এলাকা অতিক্রম করলে রতন দলের সদস্যদের হাতে হাতে চাকু ও কাঁচি ধরিয়ে দেয়। আউয়াল ধূমপানের কথা বলে বাসের গেটের কাছে যায় এবং অন্যদের ইশারা দিলে রাজা, রতন, মান্নান ও নুরনবী চালকের আসনের কাছে গিয়ে চালককে মারধর করে। এ সময় রতন চালকের আসনে বসে বাসের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ডাকাত দলের বাকি সদস্যরা বাসের চালক,  সুপারভাইজার, হেলপার ও যাত্রীদের হাত-মুখ বেঁধে আসনের কভার দিয়ে মুখম-ল ঢেকে দেয়। এরপর একে একে যাত্রীদের সঙ্গে থাকা নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে। এর আগে ডাকাত দলের এক সদস্য পাশের আসনে বসতে গেলে এক নারী প্রতিবাদ জানান। ডাকাতির সময় দুর্বৃত্তরা দলবদ্ধ ধর্ষণ করে ওই নারীকে। এছাড়া বাসে থাকা অন্য নারীদের শ্লীলতাহানি ঘটায়।

তিনি বলেন, লুটপাট শেষে বাসে মালামাল ভাগবাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধ বাধে। মধুপুরের রক্তিপাড়া এলাকায় আসার পর নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি ও চিৎকার শুনে চালকের আসনে থাকা রতন পেছনের দিকে তাকালে বাসটি দুর্ঘটনায় পড়ে। বাসটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ধাক্কা খেয়ে একটি বালুর ঢিবিতে গিয়ে আটকে যায়। সেখানে ডাকাতরা নেমে যায় এবং প্রথমে বাসে ও পরে অটোরিকশায় করে মধুপুরের কুড়ালিয়া এলাকায় রতনের এক নিকটাত্মীয়ের ফাঁকা বাড়িতে যায়। লুণ্ঠিত মালামাল নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগির পর ডাকাতরা বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে চলে যায়।

জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তার রতন হোসেন ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী। সে পেশায় গাড়িচালকের সহকারী। জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, মূল হোতা রতন হোসেন পেশায় গাড়িচালকের সহকারী। সে ২০১৮ সালে সাভার পরিবহনের একটি বাসে ডাকাতি করে। ওই বাস ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় দেড় বছর কারাগারে ছিল। জামিনে ছাড়া পেয়ে ২০২০ সালে আবার গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি অটোরিকশা ছিনতাই করে। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে রতন প্রায় ১ বছর কারাগারে ছিল। এ মামলায় জামিনে বেরিয়ে এসে আবার তার দলবল নিয়ে সাভার, গাজীপুর, সিরাজগঞ্জ এলাকায় মহাসড়কে যানবাহনে ডাকাতি শুরু করে।